প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে দেশের বৃহৎ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। কঠিন এক পথচলায় বাংলা চলচ্চিত্রে গুণগত পরিবর্তন এনেছে এই প্রযোজনা সংস্থা। বাংলাদেশে গল্প নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে অনন্য এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রযোজিত ছবির সংখ্যা শতাধিক।
এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধসহ নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে নির্মিত হয়েছে বহু চলচ্চিত্র, হয়েছে তুমুল প্রশংসিতও। যে চলচ্চিত্রগুলো নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে করেছে সচেতন, দিয়েছে সঠিক ও স্বচ্ছ ইতিহাস জানার সুযোগ।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক সিনেমা হলেও স্বাধীনতার বীজ বপন করা ভাষা আন্দোলন নিয়ে সার্বিকভাবেই দেশে চলচ্চিত্রের সংখ্যা হাতে গোনা। আরো সহজ করে বললে, ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ৭৩ বছর পরেও মাত্র তিনটি ছবির মধ্যেই আটকে আছে মহান ভাষা আন্দোলনের ক্যানভাস!
এরমধ্যে কিংবদন্তী জহির রায়হানের কালজয়ী সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছাড়া বাকি দুটি ছবি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর। এরমধ্যে একটি শহীদুল আলম খোকন পরিচালিত বাঙলা (২০০৬) এবং অন্যটি তৌকীর আহমেদ এর ফাগুন হাওয়ায় (২০১৯)।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘বাঙলা’ চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র একজন বোবা স্ত্রী। কেবল ভাষার মিছিলই সেই নারীকে চঞ্চল ও কৌতূহলী করে তোলে। বাংলায় চিৎকার করতে বলে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান একসময় সেই নারীকে স্পষ্টভাবে প্রথমবারের মতো ‘বাঙলা’ শব্দটি উচ্চারণ করায়। তখনই তার মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসে, সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সেই রক্ত শহীদ আসাদের নাকি সেই বোবা বউয়ের, সিনেমা শেষে এই প্রশ্নটি দর্শকদের মনে গেঁথে যায়। এতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন শাবনূর। মাহফুজ আহমেদ ও হুমায়ুন ফরীদি যথাক্রমে তার স্বামী ও বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন।
‘বাঙলা’ নির্মাণের প্রায় এক যুগ পর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজনা করে ‘ফাগুন হাওয়ায়’। এটি নির্মাণ করেন গুণী পরিচালক তৌকীর আহমেদ। টিটো রহমানের ‘বউ কথা কও’ গল্পের অনুপ্রেরণায় নির্মিত হয়েছে ছবিটি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে সিয়াম-তিশা ছাড়াও অভিনয় করছেন বলিউডের অভিনেতা যশপাল শর্মা, শহীদুল আলম সাচ্চু, আবুল হায়াত, আফরোজা বানু, ফারুক হোসেন, সাজু খাদেম, আজাদ সেতু, হাসান আহমেদ, নুসরাত জেরী প্রমুখ।
বাঙালির জীবনে বিশাল ভূমিকা রাখা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র নির্মাণে এমন অনিহা কেন, এ নিয়ে বহুদিন ধরেই কথা বলে এসেছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারাও। তার কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেক বাস্তবতাই উঠে এসেছে।
১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেয়া’য় ভাষা আন্দোলন ও গণ আন্দোলনকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন জহির রায়হান। এরপর তিনি ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাইলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তা বন্ধ করে দেয়।
একইরকম বাধায় থেমে যেতে হয় পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম এবং আমজাদ হোসেনকেও। দেশ স্বাধীনের পরেও কেন ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলো না, এ নিয়েও আছে কড়া সমালোচনা। তবে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা বলছেন, গল্পের অভাব আর উপযুক্ত বাজেট না পাওয়ার কারণে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তেমন কোনো চলচ্চিত্র হয়নি।
জীবন থেকে নেয়া, বাঙলা এবং ফাগুণ হাওয়ায়-এর পর অদূর ভবিষ্যতে আরো নতুন চলচ্চিত্র যুক্ত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরার জন্য আরো বেশি চলচ্চিত্র হওয়া উচিত।








