অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দুঃশাসনে দেশের শিক্ষাঙ্গন ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে দাবি করেছে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। একইসঙ্গে একাডেমিক ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে দেশে চরম অরাজকতা, প্রতিহিংসা, মব সন্ত্রাস ও নিপীড়নের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রোববার ১ মার্চ সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাব জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের শিক্ষাঙ্গনে গত ১৮ মাসে সৃষ্ট অস্থিরতা, নিপীড়ণ ও অবিচারের চিত্র তুলে ধরা হয় এবং একাডেমিক ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
বক্তব্য উত্থাপন করেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ড. অহিদুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা মহান স্বাধীনতার মাসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, ত্রিশ লক্ষ শহীদ, সম্ভ্রম হারানো দুই লক্ষ মা-বোন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।
বক্তারা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে রাশিয়াসহ যে সকল বন্ধু রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল রাজনীতি এবং টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর গঠনমূলক ভূমিকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার, সাময়িক ও স্থায়ী বহিষ্কার, অ্যাকাডেমিক বয়কট, পদাবনমন, বাধ্যতামূলক অবসর এবং প্রশাসনিক পদ থেকে অপসারণের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।
এছাড়া অসংখ্য শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল, ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সনদ বাতিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যন্ত বহু শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল এবং গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের ঘটনাও একই সময়ে ঘটেছে, যা জাতির বাক-স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও নীল দলের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলদলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন, অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ, অধ্যাপক ড. সুরাইয়া আক্তার, অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক ড. শবনম জাহান, অধ্যাপক ড. আজমল হোসেন ভূইয়া, অধ্যাপক ড. জামিলা এ চৌধূরী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. কামাল উদ্দিন প্রমুখ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্রের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান।
১৪ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে
১. বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার: গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে যে সকল শিক্ষককে বহিষ্কার বা সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের বহিষ্কারাদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।
২. মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার: শিক্ষকদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
৩. পেশাজীবীদের মুক্তি: কারাবন্দি শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, শিল্পী, প্রকৌশলীসহ সকল নিরপরাধ পেশাজীবীকে অবিলম্বে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে হবে।
৪. মব সন্ত্রাস বন্ধ ও তদন্ত বাতিল: মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে শিক্ষকদের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং তাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘তদন্ত কমিটির’ নামে হয়রানি ও একাডেমিক বয়কটের সকল আদেশ বাতিল করতে হবে।
৫. পদোন্নতি ও বঞ্চনা নিরসন: অবৈধভাবে পদ অবনমন (Demotion) এবং বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। একই সাথে যোগ্য শিক্ষকদের বকেয়া একাডেমিক পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।
৬. প্রশাসনিক পদে পুনর্বহাল: বেআইনিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদ থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা পদত্যাগে বাধ্য করা শিক্ষকদের সসম্মানে তাদের স্বপদে পুনর্বহাল করতে হবে।
৭. বেতন-ভাতা পরিশোধ: শিক্ষকদের বন্ধ রাখা বেতন-ভাতা বকেয়াসহ অবিলম্বে চালু করতে হবে।
৮. শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়া: রাজনৈতিক কারণে (নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ জড়িত) বহিষ্কৃত সাধারণ শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারাদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে তাদের শিক্ষাজীবনে ফেরার পথ সুগম করতে হবে।
৯. সার্টিফিকেট পুনর্বহাল: ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বাতিল করা সার্টিফিকেট বা সনদপত্রের আদেশ দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে।
১০. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা: অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে।
১১. পেশাজীবীদের পুনর্বহাল: সাংবাদিক, ডাক্তার, প্রকৌশলীসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত সকল পেশাজীবীকে তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে পুনর্বহাল করতে হবে।
১২. জোরপূর্বক পদত্যাগের প্রতিকার: সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার যে সকল অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের মব জাস্টিসের মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের চাকরিতে পুনঃনিয়োগ ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
১৩. শ্রমিকদের কর্মসংস্থান: বন্ধ হওয়া কলকারখানা খুলে দিয়ে চাকরিচ্যুত লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে কাজে পুনর্বহাল করতে হবে।
১৪. বাক্-স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ: গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ বন্ধ করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাতিলকৃত অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডগুলো অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে।







