চলতি মাসে ডেঙ্গু আরও জটিল আকার ধারণ করবে। এডিস মশার ঘনত্বের ব্রুটো ইনডেক্সে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার প্রতিটি মহল্লায় ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর ওপর রয়েছে। তাই পুরো শহরই ডেঙ্গু ঝুঁকিতে। এ বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ডেঙ্গুজ্বরে ১৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বর মাসে এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু জ্বরে প্রতিদিন গড়ে ৬০৩ জনের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়ে জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না, অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। পাশাপাশি এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ার কারণে এখন হটস্পট ধরে ধরে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে জোরদার করা প্রয়োজন।
ডেঙ্গুতে তিন মাসে ১৮৬ মৃত্যু
এ বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ডেঙ্গুজ্বরে ১৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বর মাসে এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু জ্বরে প্রতিদিন গড়ে ৬০৩ জনের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সময়ে দৈনিক মৃত্যুর হার দুই দশমিক ৬৬ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা গত আগষ্ট মাসের তুলনায় তিনগুনের বেশি এবং চলতি বছরের বিগত মাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ দিনে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাপসাতালে ভর্তি হয়েছে ১৮ হাজার ৯৭ জন। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৮০ জনের। আগষ্ট মাসে এই সংখ্যা ছিল ৬৫২১ এবং ২৭ জন জুলাই মাসে এই সংখ্যা ছলি মাত্র ২৬৬৯ এবং ১২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বাংলাদেশে গত একদিনে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ১১৫২ জন ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৯৩৮ জনে। বাংলাদেশে এর আগে ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এছাড়া ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন, ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। সে হিসাবে এ বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা এ যাবতকালে চতুর্থ সর্বোচ্চ।
জ্বরকে অবহেলা নয়
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, এখন যেহেতু ডেঙ্গুর সময়, সেজন্য জ্বর হল অবহেলা করা উচিত নয় জ্বরে আক্রান্ত হলেই সাথে-সাথে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছেন, তারা জ্বরকে অবহেলা করেছেন। জ্বরের সাথে যদি সর্দি- কাশি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কিংবা অন্য কোন বিষয় জড়িত থাকে তাহলে সেটি ডেঙ্গু না হয়ে অন্যকিছু হতে পারে। তবে জ্বর হলেই সচেতন থাকতে হবে। ডেঙ্গু হলে প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন – ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। এমন নয় যে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে, পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলেন, এডিস মশা ‘ভদ্র মশা’ হিসেবে পরিচিত। এসব মশা সুন্দর-সুন্দর ঘরবাড়িতে বাস করে। এডিস মশা সাধারণত ডিম পাড়ে স্বচ্ছ পানিতে। কোথাও যাতে পানি তিন থেকে পাঁচদিনের বেশি জমা না থাকে। এ পানি যে কোন জায়গায় জমতে পারে। বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দার ফুলের টবে, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন পয়েন্টে, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা টায়ার কিংবা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে।
ব্রুটো ইনডেক্স কী?
এডিস মশার ঘনত্বের ইনডেক্স যেটিকে ব্রুটো ইনডেক্স বলা হয়। সেটি যখন কোনো একটি এলাকায় ২০ বা তার অধিক হয় তখন ধরে নেওয়া হয় সে অঞ্চলে এডিস মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ইত্যাদি বেড়ে যেতে পারে। এই মুহূর্তে ঢাকার প্রতিটি মহল্লায় ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর ওপর রয়েছে। তাই পুরো শহরই ডেঙ্গু ঝুঁকিতে। তবে কোনো কোনো স্থানে সেই ইনডেক্স ৭০-এর ওপর আছে। এ ছাড়া কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, খুলনা, নরসিংদী, চাঁদপুর এবং ময়মনসিংহে এডিস মশার ঘনত্ব বেশি রয়েছে। কোনো একটি স্থানে এডিস মশার ঘনত্ব যদি বেশি থাকে এবং সেই অঞ্চলে যদি রোগী থাকে, তাহলে সেখানে জ্যামিতিক হারে ডেঙ্গু রোগটি বাড়তে থাকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব গবেষণাগার তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, এডিস মশার ঘনত্ব এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নিয়ে যে ফোরকাস্টিং মডেল তৈরি করে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, অক্টোবরে ডেঙ্গু আরও জটিল আকার ধারণ করবে। আমরা মাঠপর্যায়ে ডেঙ্গুর বাহক মশা নিয়ে যে গবেষণা কাজগুলো করি, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, ঢাকা শহরসহ বেশ কয়েকটি শহরে এডিস মশার ঘনত্ব স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
রোগীকে কেন্দ্র করে হটস্পট নির্ধারণ করা প্রয়োজন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, এই মুহূর্তে যেহেতু প্রায় প্রতিটি এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেড়েছে তাই এখন হটস্পট ধরে ধরে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে জোরদার করা প্রয়োজন। হটস্পট মশার ঘনত্বের ওপর অথবা ডেঙ্গু রোগীর ওপর ভিত্তি করে করা হয়ে থাকে। ডেঙ্গু রোগীকে কেন্দ্র করে হটস্পট নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেসব এলাকায় বা বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী আছে, সেই বাড়িকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকে ২০০ মিটার পর্যন্ত ফকিং করে ক্রাশ করে এডিস মশা মেরে ফেলতে হবে। যেখানে ডেঙ্গুর রোগী আছে সেখানকার এডিস মশাগুলো ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করতে পারে তাই তারা বেঁচে থাকলে জ্যামিতিক হারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। ডেঙ্গুর বাহক মশা যেহেতু ২০০ মিটারের বেশি দূরে উড়ে যায় না, তাই ২০০ মিটারকে কেন্দ্র করে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটা নিশ্চিত করতে পারলে ওই মহল্লায় ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হটস্পট ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি ব্রিডিং সোর্স ম্যানেজমেন্টও করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেতন হতে হবে
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেছেন, ডেঙ্গু ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমাদের সব জায়গায় অ্যালার্ট করে দেওয়া আছে। যাতে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো যায়। এ বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ডেঙ্গুজ্বরে ১৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর এ সময়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৯৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি সবাইকে সচেতন করতে। বিভিন্ন জায়গায় সবার সঙ্গে কথা বলছি। যেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়
ফুলের টব, এসি, ফ্রিজের নিচসহ বাসার যে কোনো স্থানের আবদ্ধ পানি নিয়মিত অপসারণ করুন। আপনার চারপাশের জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করুন, প্রয়োজনে জমে থাকা পানিতে ব্লিচিং পাউডার ছিটান। পানি জমে থাকতে পারে এমন জিনিসপত্র উল্টে রাখুন। এ ছাড়া পরিত্যক্ত টায়ার, ডাব-নারিকেলের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল ও আশপাশের পড়ে থাকা পাত্রের জমা পানি তিন দিনের মধ্যে ফেলে দিন। দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন। জানালায় মশা প্রতিরোধক নেট ব্যবহার করুন। শরীরের অনাবৃত স্থানে মশা নিবারক ক্রিম ব্যবহার করুন। মশা নিধনের ওষুধ, স্প্রে কিংবা কয়েল ব্যবহার করুন। পাতলা কিংবা ঢোলা পোশাক পরিধান থেকে বিরত থাকুন। শিশু এবং বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নিয়ে নিরাপদে থাকুন। আপনার বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।








