নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচন এক কদর্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেখানে প্রার্থীরা ব্যক্তিগত আক্রমণ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং পুরোনো সম্পর্কের ভাঙনকে সামনে এনেছেন। এই হাই-স্টেক ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে নিউইয়র্কবাসী মেয়র এরিক অ্যাডামসের বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তির আশা করলেও, বর্তমান পরিস্থিতি তাদের হতাশ করেছে।
সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোর প্রচারণার বিতর্কিত ভূমিকা এই তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি টেলিভিশন বিতর্কের পরই কুওমোর ক্যাম্পেইন থেকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি, বর্ণবাদী ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে ‘অপরাধী’ সেজে অনেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানিকে সমর্থন জানাচ্ছে বলে দেখানো হয়। যদিও দ্রুত ভিডিওটি মুছে ফেলা হয় এবং একজন ‘নিম্ন-পর্যায়ের কর্মীকে’ এর জন্য দায়ী করা হয়, কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী ও অনুমোদকের পরিচয় রহস্যজনকই থেকে যায়।
কুওমোর এই বিদ্বেষপূর্ণ আক্রমণের পরেই তিনি রেডিও উপস্থাপক সিড রোজেনবার্গের অনুষ্ঠানে যোগ দেন, যিনি প্রকাশ্যে ঘৃণা-পূর্ণ মন্তব্য করার জন্য পরিচিত। এই অনুষ্ঠানে কুওমো নাইন ইলেভেনের মতো দুর্ঘটনার সময় মামদানির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যার উত্তরে রোজেনবার্গ বলেন, মামদানি উল্টো ‘উল্লাস করবেন’, আর কুওমো তাতে হেসে যোগ দেন।
এই মন্তব্যের পর রাজ্য গভর্নর ক্যাথি হচুল কুওমোকে কটু ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, এই ধরনের ভয় দেখানো, ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও ইসলামোফোবিয়া নিউইয়র্কের আদর্শের পরিপন্থী। জবাবে মামদানি নিউইয়র্কের মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে এক আবেগপূর্ণ বক্তব্য রাখেন, যেখানে তিনি বলেন,কুওমো নাইন ইলেভেনের পর এই সম্প্রদায় যে অপমান ও সহিংসতার শিকার হয়েছে, তা আজও চলছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, দশ লক্ষেরও বেশি মুসলিম নিউইয়র্কবাসী আর নিজেদেরকে এই শহরে অতিথি মনে করবে না।
নির্বাচনী জরিপে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও, জোহরান মামদানি তার বামপন্থী আদর্শ থেকে সরে এসে কিছু অপ্রত্যাশিত কৌশল নিচ্ছেন, যা তার কিছু সমর্থককে হতাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মামদানি ঘোষণা করেছেন যে তিনি বর্তমান পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশকে তার পদে বহাল রাখবেন। টিশ হলেন একজন ধনকুবেরের কন্যা এবং কঠোর অপরাধ-নীতির সমর্থক, যা মামদানি ও তার প্রগতিশীল সমর্থকেরা সমর্থন করেন না।
এই বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মামদানি কেবল বলেন, আমিই মেয়র হবো, এবং সবাই আমার নেতৃত্ব অনুসরণ করবে। এছাড়া, তিনি সিটি কাউন্সিলের সদস্যদের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে আবাসন-সংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোটের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে অস্বীকার করেছেন। তার এই নীরবতা প্রগতিশীল কর্মী ও নেতারাসহ তার সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে, কারণ তারা ওই সংস্কারগুলোর পক্ষে।
এদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া তার রেডিও স্টেশনের মালিক জন ক্যাটসিমাটিডিসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, এক নাটকীয় রেডিও ভাষণে স্লিওয়া ঘোষণা করেন, এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, আমি আর কখনও স্টুডিওতে যাবো না। তিনি অভিযোগ করেন যে স্টেশনের লাগাতার আক্রমণে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে এবং তাকে সশস্ত্র নিরাপত্তা নিতে হয়েছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এই ‘উন্মত্ততার’ কারণে তার বা তার স্ত্রীর কিছু হলে দায় রেডিও স্টেশন কর্তৃপক্ষের। সব মিলিয়ে, নিউইয়র্কের এই মেয়র নির্বাচন এখন শুধু নীতির লড়াই নয়, বরং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, ক্ষমতা লিপ্সা ও নাটকীয়তার এক জগাখিচুড়ি হয়ে উঠেছে।








