ইরান স্বল্প সময়ের মধ্যেই তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় বড় ধরনের অগ্রগতি দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের সাবেক বিমান প্রতিরক্ষা প্রধান রান কোচাভ। তার মতে, ইরান সম্প্রতি এমন একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে, যার পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার যা পূর্বের ঘোষিত ২ হাজার কিলোমিটার সীমার দ্বিগুণ।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোচাভ বলেন, এই অগ্রগতি ‘রাতারাতি সক্ষমতা দ্বিগুণ’ করার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ইরান সম্ভবত দুই-ধাপবিশিষ্ট স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে তারা উন্নয়ন করে আসছে।
কোচাভ আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে এই উন্নয়ন ইরানকে কৌশলগতভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তার ব্যাখ্যায়, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বায়ুমণ্ডলের বাইরে গিয়ে পুনরায় লক্ষ্যবস্তুতে প্রবেশ করে, ফলে যেকোনো দিক থেকে আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের বহু গুরুত্বপূর্ণ শহর এখন ইরানের পাল্লার মধ্যে চলে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান এয়াল জামিরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বহু-ধাপবিশিষ্ট উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণেই এই বাড়তি পাল্লা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরান স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। এই প্রযুক্তি মূলত মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হলেও, এর মাধ্যমে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। ইরানের এই প্রযুক্তিগত দক্ষতা তাদের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণার সমন্বিত উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকদের মত।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড বা বিস্ফোরক অংশ হালকা করলে একই শক্তি ব্যবহার করে আরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব হয়। এ ধরনের প্রকৌশলগত কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমেও ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সম্ভাব্যভাবে সোভিয়েত যুগের আর-২৭ প্রযুক্তির প্রভাব থাকতে পারে বলেও উল্লেখ করেন কোচাভ। তবে তিনি বলেন, ইরান নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী এই প্রযুক্তিকে রূপান্তর করে স্থলভিত্তিক উৎক্ষেপণের উপযোগী করেছে।
এছাড়া ইরান খোররমশাহর-৪ শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নেও কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের মহাকাশ কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। যেমন, চামরান-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং কায়েম-১০০ রকেট ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বহুধাপবিশিষ্ট উৎক্ষেপণ প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করেছে।

এই ধারাবাহিক উন্নয়ন ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যায়েও কৌশলগত সক্ষমতা গড়ে তুলছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পাল্লার প্রয়োজন, তবে বহুধাপ প্রযুক্তি আয়ত্তে এলে ভবিষ্যতে সেই সক্ষমতাও অর্জন করা কঠিন হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে-ইরান ধাপে ধাপে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ প্রযুক্তিকে উন্নত করে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থান তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।


