এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
প্রত্যেক প্রজন্মেরই তার নিজস্ব দর্শন, আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, যা তাদের সমাজ ও জীবনধারাকে প্রভাবিত করে এবং সে দর্শন ও আচরণ তাদের বেড়ে উঠার পরিবেশ ও প্রতিবেশ থেকে পেয়ে থাকে। জেন জি-জেন আলফা! কীভাবে এসকল পরিচিতিমানের সূচনা? যদিও কোন কমিশন বা সংস্থা কর্তৃক কোন একটি প্রজন্মের বয়সসীমা ধরে দেয়া হয়নি, একটি বিশ্বজনীন সামাজিক মতৈক্যের মত আমরা ধরে নিয়েছি ১৯৯৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত জেন জি আর ২০১২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত জেনারেশন আলফা, ২০২৫ থেকে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে জেন-বিটা । ‘জেনারেশন গ্যাপ’ নামে একটি শব্দও হরহামেশাই দেখতে পাই। বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই শব্দটি ব্যবহারেরে পেছনে আছে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ নামক আরেকটি প্রত্যয়, যেখানে জেনারেশন গ্যাপ অর্থাৎ প্রজন্মের থেকে প্রজন্মের চিন্তার দূরত্ব আর ডিজিটাল ডিভাইড মানে বুঝাচ্ছে প্রযুক্তিতে প্রবেশে বৈষম্য অথবা অপ্রাপ্যতা, যেমন একটি জেনারেশন হয়তো ব্যাংকিং লেনদেনদের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ ব্রাঞ্চে গিয়ে টাকা জমা দিতে স্বাছন্দ বোধ করে আরেকটি প্রজন্ম এটিএম বুথে জমা দিতে স্বাছন্দ বোধ করে আবার আরেকটি প্রজন্ম হয়ত নগদ লেনদেনেই অনীহা, আজকাল এই ব্যবধান তৈরি হচ্ছে মূলত প্রযুক্তির কারণে— শিল্প, রাজনীতি বা সংস্কৃতি নয়।
আবার ধর্তব্য যে, এই সকল প্রজন্ম সমাজে মিলেমিশে বসবাস করছে। তাই সমাজের কর্মকুশলতা আর শৃঙ্খলাবোধ বৃদ্ধিকল্পে আরেকটি প্রত্যয় নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে, “প্রজন্মের সেতুবন্ধন” এবং এই ধারণার মূলে অবস্থান করবেন শিক্ষকরা। আমার পেশাগত জীবনের সাথে মিলিয়ে বলতে হলে, একজন প্রশিক্ষক হিসেবে আমি দেখছি কীভাবে ডিজিটাল ডিভাইস, সোশ্যাল মিডিয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ এআই আমাদের ক্লাসরুমের পরিবেশকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে, এবং প্রতিটি প্রজন্ম কীভাবে এ পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে ! হাওর অঞ্চলে শ্রেণিকক্ষে স্মার্ট বোর্ড থেকে পাহাড়ি অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিবর্তন যেমন এনেছে শিক্ষার্থীদের তেমনি খাপ খাইয়ে নিতে হবে শিক্ষকদের, যেখানে হয়তো বেশিরভাগ শিক্ষকরা তাদের বাল্যকালে এসবের কিছু দেখেননি, চিন্তাও করেননি। যদি তাই হয়, আমদের কীভাবে প্রস্তুত হতে হবে এই প্রজন্মের সেতুবন্ধন রচনার অভিযোজনের যাত্রায়?
১৯৯০ এর দশকে, অথবা ৯০’এর শেষের দিকের যাদের আমরা মিলেনিয়াল বলে থাকি তারা বেশ চ্যালেঞ্জিং সময় পার করে এসেছে । অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে বিভ্রান্ত হয়েছেন বা অতিরিক্ত চাপ অনুভব করেছেন। বিনোদনমূলক অ্যাপ এবং গেমগুলোর সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকের প্রতিযোগিতা শিক্ষার গতিকে প্রভাবিত করেছে। এই শিক্ষার্থীরা এক অর্থে “নীরব ট্রেন্ডের শিকার”— যাদের অনেকেই কখনো পুরোপুরি তাদের সক্ষমতার শিখরে পৌঁছাতে পারেনি।
সময়কালকে যদি ১৯৯০-এর শেষের দিক থেকে ২০১৫-পর্যন্ত বিবেচনা করি-এই সময়ে জন্মগ্রহণকারী “জেন জি” এমন সময় বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছে, যখন ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তাদের পূর্ন বিকাশে ছিল। তারা অ্যানালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের শিকার হয়নি বরং ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে জন্মগতভাবে অভ্যস্ত। ফলে তারা সহজেই অনলাইন রিসোর্স, অ্যাপস এবং শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারে। আবার এই “জেন জি” এর বেশিরভাগ শিক্ষক কিন্তু পূর্ববর্তি প্রজন্মের।
ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, এক যুগে যা ক্ষতিকর মনে হয়, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। “জেনারেশন আলফা” —যারা এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে— তাদের স্মার্টফোন ব্যবহার “জেন জি”-এর তুলনায় আরও বেশি। কিন্তু তাদের জন্য ডিজিটাল অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার একটি অংশ। তারা স্বভাবতই ফোন ব্যবহার করে পড়াশোনা, বই পড়া, সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সৃজনশীল কাজের জন্য। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক অ্যাপ এবং ডিজিটাল কন্টেন্ট তাদের শেখার প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু পুরনো প্রজন্মের শিক্ষক, অভিভাবক এবং নীতি নির্ধারকরা প্রায়শই এই অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। কেননা তারা এমন সময় বড় হয়েছেন যখন স্ক্রিন ছিল না। কিন্তু এটাও সত্য তারা যে সময় বড় হয়েছেন সেখানে কোন এআই ছিল না, তারা বাল্যকালে তো এআই এর ক্ষতিকর দিকগুলো মোকাবিলা করে বড় হননি, তাই তারা সহজেই সংক্ষিপ্ত মনোযোগ, মুখোমুখি যোগাযোগের অভাব এবং তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির প্রতি ঝোঁকের ক্ষতিকর প্রভাব দেখতে পারেন কিন্তু সার্বিকভাবে এসবকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। তাদের কাছে ক্লাসরুমে মোবাইল ফোন প্রায়শই বিভ্রান্তিকর মনে হয়। তারা এমন সময়কে স্মরণ করেন, যখন পড়াশোনার মানে ছিল শিক্ষক, কাগজ এবং বই। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইস আর এআই এর সাথে যুদ্ধ করে বড় হচ্ছে, ভবিষ্যতের সমাজ ব্যবস্থা এই প্রজন্মের জন্য লিখিত হচ্ছে। এতটুকু আমাদের বুঝতেই হবে।
তবে, নীতি নির্ধারক এবং শিক্ষকরা জানেন যে ঝুঁকি পুরোপুরি মিলিয়ে যাচ্ছে না, প্রযুক্তি শিক্ষায় সহায়ক হতে পারে, তবে অতিরিক্ত ব্যবহার বিভ্রান্তি এবং চাপও তৈরি করতে পারে। স্ক্রিন আসক্তি, মনোযোগের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা প্রায়শই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তি কিন্তু নিজে নিরপেক্ষ তবে শিক্ষার্থীরা কীভাবে এটি ব্যবহার করছে, সেটিই নির্ধারণ করে এটি একটি শিক্ষা সহায়ক হবে, না কি ফাঁদ! যেমন, ইদানীং দেখা যাচ্ছে অনেকেই এআই দিয়ে নিজের ছবি এডিট করে সামাজিক মাধ্যমে আপলোড দিচ্ছে, বলাই বাহুল্য সমাজে প্রচলিত সৌন্দর্যের মান অনুযায়ী সে ছবিগুলো তৈরি করে দিচ্ছে বিভিন্ন জেনারেটিভ এআই, বন্ধুরা তার ছবি দেখে বিভিন্ন পজিটিভ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে অতঃপর নিজের আসল অবয়ব সম্পর্কে তার হীনমন্যতায় ভোগা এবং ডিপ্রেশন আর সোশাল এংজাইটি কি খুব অস্বাভাবিক?
পরিবারকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। শিশুদের প্রযুক্তির জন্য দোষারোপ করার বদলে, অভিভাবকরা শিক্ষকদের সাথে কথা বলে ডিভাইস ব্যবহারের সুষম ব্যবহার তৈরি মডেল করতে পারেন। যেমন পড়াশোনা, বাইরের খেলা এবং দৈনন্দিনের প্রযুক্তি একসাথে ব্যবহার করা। বিদ্যালয়ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং “ডিজিটাল ডিটক্স” কর্মশালার মাধ্যমে সমর্থন দিতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা সচেতনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখবে।
এখানে প্রজন্মের ব্যবধান কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গিরও ব্যাপার। বয়স্ক প্রজন্ম সতর্কতা নিয়ে আসে, কারণ তারা জানে বিভ্রান্তি মনোযোগকে কীভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। নবীন প্রজন্ম অভিযোজন নিয়ে আসে এবং প্রযুক্তিকে সৃজনশীল উপায়ে ব্যবহার করে। এই চিন্তার ব্যবধান কমাতে আমাদের প্রয়োজন সহানুভূতি এবং সহযোগিতা। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা বলার সুযোগ দেবেন, আর শিক্ষার্থীরা ভিন্ন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করবেন। নীতিনির্ধারকদের যুগের সাথে মিলিয়ে , দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নীতিমালা তৈরি করতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থা নিজেও পরিবর্তিত হতে হবে। পুরনো পাঠ্যক্রম আজকের শিক্ষার্থীর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ২১ শতকের ক্লাসরুম ডিজিটাল দক্ষতা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং এআই সাক্ষরতা উপেক্ষা করতে পারবে না। এগুলো শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হতে হবে।
এবার শিক্ষকদের বিবেচনা করা যাক, জেনারেশন গ্যাপের বদ্ধমূল ধারণা ভুলে যেতে হবে, হ্যাঁ জেনারেশন গ্যাপ বাস্তব, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে আমাদের ভূমিকা হলো আন্তঃপ্রজন্ম প্রজন্মে সেতুবন্ধন সৃষ্টি। শিক্ষার্থীদের দায়িত্বপূর্ণভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখানো। শুধু নিষিদ্ধ বা সম্পূর্ণ গ্রহণ করাই সমাধান নয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্লাসে মোবাইল ফোনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়— গবেষণা, ইন্টারেক্টিভ কুইজ বা সহযোগিতামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে। এতে শিক্ষার্থীরা কেবল পাঠ্যক্রমই শিখে না, বরং ডিজিটাল শৃঙ্খলাও অর্জন করে। সেতুবন্ধন গড়া মানে শুধু পাঠদান নয়, মনোভাব পরিবর্তন। শিক্ষককে শুধু বিষয়ের জ্ঞান নয়, ডিজিটাল সরঞ্জাম এবং ক্লাসরুম পরিচালনার দক্ষতাও শিখতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিকে লক্ষ্যপূরণের সহায়ক হিসেবে দেখানো এবং সময়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়, এটাই আসল চ্যালেঞ্জ। শিক্ষায় প্রজন্মের ব্যবধান সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব অবিসংবাদিত। এই ব্যবধানকে একটি সেতুতে রূপান্তর করতে হবে, যা প্রযুক্তির সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা দরকার। প্রতিটি শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী এই সেতুতে অবদান রাখবে। যদি আমরা সফল হই, বিভ্রান্তির শিকার শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমবে,নতুন প্রজন্মের শিক্ষার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে।
হ্যাঁ, ব্যবধান বাস্তব। কিন্তু এটি বিভাজনের কারণ না হওয়াই বাঞ্ছিত। সহানুভূতি, অভিযোজনমূলক এবং শিক্ষাগত নেতৃত্বের মাধ্যমে আমরা এটিকে একটি শক্তিশালী সেতুতে রূপান্তর করতে পারি—যা আজকের শিক্ষার্থীদের আগামী দিনের সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে, ভবিষ্যতে সুশিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
লেখক: মো. রোকন উদ দৌলা, ইন্সট্রাক্টর (সাধারণ) প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, গাজীপুর। [email protected]








