রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। দেশের মানুষ আজ বিজয়ের ৫২ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। রণাঙ্গনে ক্রীড়াঙ্গনের মানুষদের বীরত্ব গাঁথার উপর দাঁড়িয়ে দেশের খেলাধুলা। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দলের জন্ম দিয়েছিল রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ। ইতিহাসের পাতায় যাদের নাম হয়েছে চিরস্মরণীয়- স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
পুরো জাতিকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে মারাত্মক মারণাস্ত্র নিয়ে ২৫ মার্চ একাত্তর ঘুমন্ত জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালি নিধন যজ্ঞ। এ থেকে ক্রীড়াঙ্গনের মানুষরাও বাদ যাননি। ক্রীড়া সংগঠক মুশতাক আহমেদকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলে সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল। আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে খেলা সাড়া জাগানো ওপেনার জুয়েল মুক্তিযুদ্ধে অংশ দেন। পাকিস্তানি সেনারা তাকে আটকের পর হত্যা করে।
বাঙালি নিধনের মাঝে পাকিস্তান সরকার চেয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্ট চালু রাখতে। বহির্বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছিল ঢাকার অবস্থা স্বাভাবিক। গণহত্যাসহ নানা অপরাধ ঢাকতেই ছিল তাদের এমন পরিকল্পনা। তবে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের লক্ষ্য ছিল, খেলোয়াড়দের নিয়ে ভারতে নিয়ে আসার, যাতে খেলার আয়োজন না হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের জুন মাসে গঠিত হয় কালজয়ী স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
মহান বিজয় দিবসে চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অতীতের স্মৃতিচারণ করেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা তানভীর মাজহার তান্না। যুদ্ধকালীন ফুটবল দল গঠন নিয়ে দিলেন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক এক তথ্য।

নানা চরাই উতরাই পেরিয়ে যুদ্ধের মাঝে ভারতে যাওয়ার পর আগরতলায় পৌঁছান তান্না। পরে তিনি বালুরঘাটে যান। সেখানেই বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি পান। সেই চিঠিই ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্মসূত্র।
‘একদিন দেখি জাকারিয়া পিন্টু (স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক) ভাই এসে হাজির। এসে আমাকে বলেন এই যে চিঠি , তোমাকে যেতে হবে। তাজউদ্দিন সাহেবের চিঠি। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি বানিয়েছি। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, সব টিমের খেলোয়াড়রা চলে আসুক এটাই আমরা চাচ্ছি।’
‘প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ সাহেবের চিঠিতেই উল্লেখ ছিল, আমি দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবো। সরকার থেকেই আমাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।’
‘আমি তো কলকাতায় ছিলাম না। তাই জানতাম না কীভাবে বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি গঠিত হয়েছিল। সংগঠনটির প্রথম সভাপতি ছিলেন আশরাফ আলী চৌধুরী। উনি ঢাকার এমপি ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন লুৎফর রহমান। শাফায়েত জামিলের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কলকাতা গেলাম। যেয়ে দেখি ২০-৩০ জন খেলোয়াড় ছিল। আমি সবাইকেই চিনি।’
যুদ্ধকালীন অবস্থায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সবাই হয়ে পড়েছিলেন বিচ্ছিন্ন। জীবন বাঁচাতে সবাই দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। এমন বিপদসংকুল পরিস্থিতির মাঝে ফুটবলারদের সবাই কীভাবে একত্রিত হয়েছিলেন, সেই ইতিহাসটাও জানালেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার।

‘বাংলাদেশ সরকারই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সব ফুটবলারকে ভারতে আসার ঘোষণা দিয়েছিল। বেতারের মাধ্যমেই খেলোয়াড়দের বলেছিল, আপনারা চলে আসেন। প্রতিদিন ছোট করে একটা বিবৃতি দিতো। খেলোয়াড়রা যারা চলে এসেছিল। সাতারু অরূপ নন্দীও চলে এসেছিল। আমরা বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির অধীনে ছিলাম।’
‘আমাদের দারুণ একটা স্পোর্টসম্যান ছিল। নাম ছিল মিরাজ। ওকে মেরে ফেললো পাকিস্তানি আর্মিরা। সে তখন পাকিস্তানের এক নম্বর পোলভল্টার ছিল। অধিকাংশ খেলোয়াড় চলে আসে। বর্ডারের ওইদিকে চলে আসে, আগরতলা চলে আসে।’
অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার পর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ২৫ জুলাই নদীয়া জেলায় কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে কৃষ্ণনগর একাদশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামে। ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধকালীন ফুটবল দল মাঠে নামার আগের সেই অনুভূতির কথা বলেন তানভীর মাজহার তান্না।
‘উত্তেজনার মাত্রা মারাত্মক উঁচুতে ছিল। খেলোয়াড়দের তো আরও বেশি ছিল। ২০ হাজার লোক হাজির। এরকম বিশাল সংখ্যক দর্শক আসবে, ভাবতে পারিনি। কোনো একটা জায়গা খালি ছিল না। উল্টো শুরুর একাদশ সাজানো নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমার হাতে তো সব ভালো ভালো খেলোয়াড়। স্ট্রাইকিংয়ে আমার শাহজাহান ভাই, সালাউদ্দিন, নওশের, এনায়েত, তসলিম ছিল। ফ্রস্ট আর মিডফিল্ড সাজাতে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। আশরাফকে পরে ডিফেন্সে নিলাম। আসলে আশরাফ ফরোয়ার্ড ছিল। তখনকার দিনে পাঁচটা ফরোয়ার্ড খেলতো। ইনসাইড ফরোয়ার্ড, রাইট ইনসাইড ফরোয়ার্ড, লেফট উইং, রাইট উইং আর স্ট্রাইকার। শুরুর একাদশ বানানো আসলেই কঠিন ছিল।’

‘বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে যখন তারা দৌড়াল পুরা মাঠ, দর্শকদের যে পরিমাণ উল্লাস সেটা অবিশ্বাস্য ছিল। এটা আমরা জীবনেও ভুলতে পারবো না। আমরা সবাই কাঁদছিলাম। আসলে কেউ জানতাম না, কবে দেশে ফেরত আসব। পরিবারের অবস্থা ভালো থাকলেও দেশের বাইরে পকেটে টাকা-পয়সা তেমন ছিল না। ভিক্ষুকের মতো অবস্থায় ছিলাম। বন্ধুবান্ধব না থাকলে, ফুটবল না থাকলে দেশের বাইরে টিকে থাকাটা অসম্ভব ছিল। ২০ টাকা করে সবাইকে হাত খরচের জন্য দিতো। আমি অবশ্য নিতাম না। টাকাটা সালাউদ্দিনকে দিয়ে দিতাম।’
‘ভারতের মাটিতে ১৭টা ম্যাচ খেলেছি। প্রথম ম্যাচটা ইন্টারেস্টিং ছিল। কারণ আমরা বুঝি নাই এতো লোক হবে। স্টেডিয়াম পরিপূর্ণ, পাশের বাড়ির ছাঁদ ভরে গিয়েছিল । মাঠে ঢুকে দেখলাম একটা সুবিধাজনক অবস্থা আমাদের জন্য হয়ে গেছে। আমরা নিজেরা আলোচনা করে আয়োজকদের বললাম, পতাকা উড়াও। পতাকা না উড়ালে আমরা খেলবো না। এত লোক হয়ে যাওয়ায় ওরা চাপে পড়ে যায়। পরে নদীয়ার জেলা প্রশাসক এসে নিজেই সাহস নিয়ে বললেন আপনারা এটা করেন। তারপর ফুটবলাররা জাতীয় পতাকা নিয়ে সারা মাঠ ঘুরল। আমরা জাতীয় সঙ্গীত গাইলাম, তারপর খেলা শুরু হল।’

বিদেশের মাঠে বাংলাদেশ তখনো স্বীকৃতি পায়নি। তাই এমন ম্যাচ আয়োজনের কারণে ফিফাতে পাকিস্তান অভিযোগ জানাল। ফিফা আবার অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনকে বিষয়টি অবহিত করে। অফিসিয়াল একটি দল নামানোয় অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন নদীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগী পদ সাসপেন্ড করে দিল। জেলা প্রশাসককে ভারত সরকার সাসপেন্ড করেছিল। যদিও পরে চাকরি ফিরে পেয়েছিলেন।
এ ঘটনার পর নাম পরিবর্তন করে সবাই খেলা শুরু করে বলেই জানালেন তান্না। বললেন, ‘মোহনবাগান খেলেছিল গোষ্টপাল এলেভেন নামে। তিনি ছিলেন ভারতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক। সেই খেলায় উনি মাঠে উপস্থিত ছিলেন।’
‘একটা দল নাম পাল্টে হয়ে যায় বোম্বে ইলেভেন। আমাদের বিপক্ষে খেলেছিলেন ভারতের তারকা ক্রিকেটার নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি। তিনি বোম্বে দলের অধিনায়ক ছিলেন। ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হলেও ফুটবলও খেলতেন। খুব ভালো খেলতেন। আমরা আসলে তাকে দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সিনেমা জগতের অনেক তারকারা সেদিন উপস্থিত ছিল। দেব আনন্দ, দিলীপ কুমার, সায়রা বানু, জনি ওয়াকার, শর্মিলা ঠাকুর, তখনকার সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অনেকেই ছিলেন।’







