সেই সময়ের কথা। ঝিমিয়ে পড়ছে ক্রিকেট। দর্শক আগ্রহ কমে যাচ্ছে দিনকে দিন। ভাটা পড়ছে স্পন্সরশীপে। ভাবনায় ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোদ্ধারা। যেকোনো মূল্যে ক্রিকেটে প্রাণ আনা চাই, মাঠে ফেরানো চাই-ই-চাই দর্শকদের। এমন ভাবনা থেকেই ক্রিকেটকে নতুন মোড়কে নিয়ে আসেন ইসিবি বোর্ডের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ স্টুয়ার্ট রবার্টসন। জন্ম হয় নতুন এক ক্রিকেট ফরম্যাটের। টুয়েন্টি-টুয়েন্টি যার নাম।
নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এখন মারকাটারি ক্রিকেটের সেই ফরম্যাটটি বেশ আকর্ষণীয় খেলা। ২০০৭ সালে যাকে স্বীকৃতি দেয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে চ্যানেল আই অনলাইনের আয়োজনে থাকছে টি-টুয়েন্টির সেই আবিষ্কার সমাচার।
এই শতাব্দীর শুরুর দিকে হঠাৎ দর্শক কমতে শুরু করেছিল স্টেডিয়ামগুলোতে। কাউন্টি ম্যাচে ১৭ শতাংশ দর্শক কমে গেলে কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চালান রবার্টসন। তার জরিপে উঠে আসে দর্শক ভাটা পড়ার নানা কারণ। যার মধ্যে একটা বড় অংশ ভাবতেন খেলাটা অভিজাত শ্রেণির মানুষদের।
অন্যদিকে তরুণরা মনে করতেন ক্রিকেট বয়স্কদের একটি খেলা। যার ফলাফলের জন্য ৪-৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি খেলাটির ছোট সংস্করণ, ওয়ানডেও একটি পুরো দিন লাগিয়ে দেয়। যা দর্শককে ক্রিকেট বিমুখ করে তুলছে।
২০০১ সালে রবার্টসন জরিপের ফলাফল কাউন্টি চেয়ারম্যানদের কাছে তুলে ধরেন। দর্শক টানতে প্রতি ইনিংসে ২০ ওভার করে খেলার একটি ফরম্যাট প্রস্তাব করেন। পরে নতুন ফরম্যাটটি গ্রহণের পক্ষে ভোট হলে ১১-৭ ভোটে জিতে ম্যাচ আয়োজনের স্বীকৃতি পান রবার্টসন।
এরপর ২০০৩ সালের ১৩ জুন, ইংলিশ কাউন্টি দলের মধ্যে প্রথম টি-টুয়েন্টি কাপ (পরবর্তীতে যার নাম হয় টি-টুয়েন্টি ব্লাস্ট) আয়োজন হয়। যেখানে প্রথম দল হিসেবে রোজ বোলে মাঠে নামে হ্যাম্পশায়ার-সাসেক্স। টুর্নামেন্টে ফাইনালে ওঠে সারে লায়ন্স ও ওয়ারউইকশায়ার বিয়ার্স। যেখানে ৯ উইকেটের জয় পায় ওয়ারউইকশায়ার।
পরের বছর ২০০৪ সালের ১৫ জুলাই, ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর লর্ডসে আনুষ্ঠানিক টি-টুয়েন্টি খেলতে মাঠে নামে মিডলসেক্স ও সারে লায়ন্স। যেখানে ম্যাচটি মাঠে বসে উপভোগ করতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয় ২৭ হাজার ৫০৯ জন দর্শক। যা ১৯৫৩ সালের পর রেকর্ড। ওই ম্যাচেই বদলে যায় টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের ভাগ্য। নতুন ফরম্যাটের ক্রিকেটে মুগ্ধ হয় ক্রিকেটপ্রেমীরা।
ইংল্যান্ড জয় করে নতুন ফরম্যাটের ক্রিকেট যায় অস্ট্রেলিয়ায়ও। ২০০৫ সালের ১২ জানুয়ারি, ওয়াকা গ্রাউন্ডে ওয়েস্টার্ন ওয়ারিয়র্স ও ভিক্টোরিয়ান বুশরেঞ্জারের মধ্যে ম্যাচ দেখতে মাঠে উপস্থিত হয় ২০ হাজার সমর্থক। যা ২৫ বছরের ইতিহাসে ওই মাঠের রেকর্ড দর্শক উপস্থিতি।
পরে সেই ম্যাচের সাফল্যে জাতীয় পোশাকেও খেলার সিদ্ধান্ত নেয় অজিরা। প্রথম দেশ হিসেবে প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডকে উড়িয়ে আনে ঘরের মাঠ অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে। যেখানে ১৯৮০ সালের স্মৃতি বিজড়িত জার্সি গায়ে চেপে মাঠে নামে দু’দল। ম্যাচে জয় পায় অজিরা। যা ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি।
তাসমান সাগরপাড়ে টি-টুয়েন্টির জোয়ার বইয়ে ক্যারিবিয়ান ধনকুবের অ্যালেন স্ট্যানফোর্ডের হাত ধরে টি-টুয়েন্টি যায় গেইল-পোলার্ডের দেশে। যেখানে পুরস্কার হিসেবে রাখা হয় বিশাল অঙ্কের প্রাইজমানি। সেই থেকে শুরু হয় টাকার ঝনঝনানিও।
২০০৬ সালের ১১ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই গড়ায় স্ট্যানফোর্ড ২০/২০ আসর। আসরে টোবাগোকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ১ লাখ ইউএস ডলার প্রাইজমানি জিতে নেয় গায়ানা ত্রিনিদাদ।
টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট কতটা আপন করে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সেটা ক্রিকেটবিশ্ব আরও একবার দেখে ২০০৭ সালের ৫ জানুয়ারি। ব্রিসবেনের গ্যাবাতে কুইন্সল্যান্ড বুলসের মুখোমুখি হয়েছিল নিউ সাউথ ওয়েলস বুলজ। ১১ হাজার ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে সব টিকিট অগ্রিম বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।
ম্যাচের দিন অবশ্য খেলা দেখতে উপস্থিত হয় বাড়তি ১৬ হাজার দর্শক। তৈরি হয় ভীতিকর পরিস্থিতি। পরে সমর্থকদের চাপ সামলাতে না পেরে গেট ফেলে পালিয়ে যায় গেটম্যানরাই। মাঠে বসে খেলা দেখে ২৭ হাজারের উপর দর্শক।
টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা দেখে সংক্ষিপ্ত এই ফরমেটে বিশ্বকাপ আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয় আইসিসি। সাউথ আফ্রিকার মাটিতে বসে বিশ্ব টি-টুয়েন্টির প্রথম মহারণ। নক আউট পর্বের প্রথম আসরে অংশ নেয় ১২ দল। যেখানে মোট ২৭ ম্যাচ মাঠে গড়ায় এবং ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। আসরে ৫ লাখের উপর সমর্থক মাঠে বসে খেলা উপভোগ করেছিল।
এরপর থেকে নিয়মিতই বসছে টি-টুয়েন্টির বিশ্ব আসর। এবার অস্ট্রেলিয়ায় আসরের অষ্টম পর্ব বসছে রোববার থেকে। প্রথম রাউন্ডের খেলায় শুরু মহাযজ্ঞ, বাছাই শেষে মূলপর্ব সুপার টুয়েলভ। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া টি-টুয়েন্টির বর্তমান চ্যাম্পিয়ন।








