প্রথম রাউন্ড ও সুপার টুয়েলভ পর্ব শেষে এবার সেমিফাইনাল লড়াইয়ের পালা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে। বুধবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায় সিডনিতে সেরা চারের প্রথম রোমাঞ্চে মুখোমুখি হবে নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তান।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় যখন খেলা শুরু হবে, আকাশ মেঘমুক্ত থাকবে। এমন জানানো হয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে। রাত ১০টার দিকে আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকার কথা, সেটির সম্ভাবনা ৪৭ শতাংশ। খেলার মাঝে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই বলা যায়।
ইতিহাস বলছে, নিজেদের ভালো দিনে দুদলই হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। আবার যেদিন মাঠের পারফরম্যান্স হয় খারাপ, সেদিন ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাওয়ার নজির আছে দুদলেরই। পাকিস্তানের বেলায় কথাটি আরও বেশি বাস্তব! আনপ্রেডিক্টেবল দলটি এবারের বিশ্বকাপেও যার প্রমাণ দিয়েছে। সেমির লড়াইয়ে এসেছে বহু হিসাব-কিতাব মিলিয়ে।
সুপার টুয়েলভে গ্রুপ ১-এ ৭ পয়েন্ট ও সর্বোচ্চ +২.১১৩ নেট রানরেট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় নিউজিল্যান্ড। গ্রুপ ২-এ থাকা পাকিস্তান ৬ পয়েন্ট নিয়ে হয় রানার্সআপ। দুদলই তিনটি করে ম্যাচ জিতেছে। কিউইরা এক ম্যাচে হারে এবং আরেক ম্যাচ বৃষ্টিতে পণ্ড হওয়ায় পয়েন্ট ভাগাভাগি করে। পাকিস্তান হেরেছে দুই ম্যাচ।
টি-টুয়েন্টিতে মুখোমুখি লড়াইয়ে নিউজিল্যান্ড এবং পাকিস্তান ২৮টি ম্যাচে নেমেছে। নিউজিল্যান্ড ১১টি জয় তুলেছে, পাকিস্তান জিতেছে ১৭ ম্যাচে। বিশ্বকাপের মঞ্চে ৬ বারের দেখায়ও এগিয়ে পাকিস্তান। তাদের ৪ জয়ের বিপরীতে পরাজয় দুবার। গত বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে পাকিস্তান ৫ উইকেটে জিতেছিল কিউইদের বিপক্ষে।
সবশেষ পাঁচবারের দেখায় ৪টিতে হেরেছে কেন উইলিয়ামসনের দল। বিশ্বকাপের আগে ত্রিদেশীয় সিরিজে পাকিস্তানের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ড পেয়েছিল সবশেষ জয়ের স্বাদটি। যদিও ঘরের মাঠে ফাইনালে হেরে হয়েছিল রানার্সআপ।
পরিসংখ্যান বলছে, দুদলের খেলায় আগে ব্যাট করে নিউজিল্যান্ড জিতেছে ৫ বার, পাকিস্তান ৯ বার। রানতাড়া করেও জয়ের সংখ্যাটা পাকিস্তানের বেশি, মোট ৮ বার। বিপরীতে কিউইদের ৬ বার।
নিউজিল্যান্ড যে ১১ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে জিতেছে, এরমধ্যে ৮টি ছিল ঘরের মাঠে, বাকি ৩টি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। অবাক তথ্য, পাকিস্তান এখনও নিজেদের দেশে কিউইদের সঙ্গে কোনো টি-টুয়েন্টি ম্যাচই খেলেনি। ১৭টি জয়ের ১০টি তারা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ও ৭টি নিউজিল্যান্ডের মাটিতে জিতেছে।
ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের বিশ্বকাপে দুবার সেমিফাইনাল খেলেছে নিউজিল্যান্ড। ২০০৭ সালে প্রথম আসরে পাকিস্তানের কাছে হেরে তাদের ফাইনালে খেলা হয়নি। এবার কিউইদের সামনে সেটার প্রতিশোধের সুযোগ!
গত বছরের ফাইনালিস্ট ছিল কেন উইলিয়ামসনের দল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিততে না পারায় চোখের সামনে দিয়ে চলে গেছে ট্রফি। এবার এমনটি তারা হতে দিতে চায় না। সেজন্য মেলবোর্নে শিরোপা লড়াইয়ে যাওয়ার আগে পাকিস্তান বাধা তো পেরোতে হবে।
চলতি বিশ্বকাপে গ্লেন ফিলিপস এসসিজিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬৪ বলে ১০৪ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫৮ বলে ৯২ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন ডেভন কনওয়ে। এই দুই ব্যাটারের সেমিতে জ্বলে ওঠা নিউজিল্যান্ডের জন্য খুব দরকার।
বল হাতে টিম সাউদির কাছে কিউইরা বিশেষ কিছু প্রত্যাশা করতে পারে। আসরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২.১ ওভারে মাত্র ৬ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। এসসিজির সেই আগুন ঝরানো পারফরম্যান্স সাউদি আবারও দেখালে পাকিস্তানি ব্যাটারদের জন্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হতে চলেছে।
সিডনিতে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ইফতিখার আহমেদ এবং শাদাব খান ৩৬ বলে ৮২ রানের জুটি গড়েন। এটিই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। ওই ম্যাচে বল হাতে শাদাব রাখেন বড় ভূমিকা, ১৬ রান খরচায় নেন ২ উইকেট। শেষ চারের লড়াইয়ে এই দুই ক্রিকেটারের উপর অনেকটা নির্ভর করতে হতে পারে পাকিস্তানকে।
পাকিস্তানের অবশ্য টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে রেকর্ড বেশ ভালো। প্রথম আসরে শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে হয়েছিল রানার্সআপ। দ্বিতীয় আসরে হয় চ্যাম্পিয়ন। চারবার খেলেছে সেমিফাইনাল।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সার্বিক পরিসংখ্যানে অনেকটাই এগিয়ে পাকিস্তান। সেমিতে নামার আগে বাবর আজমের দল স্বাভাবিকভাবেই উজ্জীবিত থাকবে। ভারত ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে তাদের বাদ পড়াটাকে মনে হয়েছিল সময়ের ব্যাপার! পরের দুই ম্যাচে নেদারল্যান্ডস ও সাউথ আফ্রিকাকে হারালেও আশাটা কেবল কাগজে-কলমে টিকে ছিল।
শক্তিশালী সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে সেমিফাইনালের সমীকরণ নাটকীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। এতে অঘোষিত কোয়ার্টার ফাইনালে রূপ নেয় বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ। টাইগারদের সামনেও সেমিতে যাওয়ার সুযোগ ছিল। সেই ম্যাচ জিতে শেষ চারের টিকিট কাটে বাবরের দল।
নিউজিল্যান্ডের সেমিতে যাওয়ার রাস্তা তুলনামূলকভাবে মসৃণ ছিল। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে ৮৯ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে রানরেটটাকে মজবুত অবস্থানে রাখে তারা। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের সমান ৭ পয়েন্ট থাকলেও কিউইরা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
সেমি ও ফাইনালে ওঠার নজির থাকলেও শিরোপাটা নিউজিল্যান্ডের অধরাই থেকে গেছে। টিম স্পিরিটের জন্য বিখ্যাত দলটি এবারও ট্রফি জয়ের মন্ত্র জপছে। সেজন্য অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের ব্যাটিংয়ের দিকে দলটিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
প্রথম সেমির ভেন্যু সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে এই দুদল কখনোই ২০ ওভারের ক্রিকেটে মুখোমুখি হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, দেড়শ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস ধরে রাখা সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড বা এসসিজিতে হয়েছে ১৮টি আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি। আগে ব্যাটিং করা দল জিতেছে ১১ বার, হেরেছে ৬ বার। একটি ম্যাচ হয়েছিল পরিত্যক্ত। এবারের বিশ্বকাপে আগে ব্যাট করা দল জিতেছে ৫ বার, রান তাড়া করে জয়ের নজির একবার।
আগে ব্যাট করা দল বেশিরভাগ ম্যাচে জয়ের সংখ্যাতেই শুধু সফল নয়, রান তোলাতেও এগিয়ে। প্রথম ব্যাটিং করা দলের গড় রান ১৬৬। পরে ব্যাট করা দলের তা কমে দাঁড়ায় ১৩২ রানে। অতীত বিবেচনায় শেষ চারের লড়াইয়ে তাই টসজয়ী অধিনায়ক আগে ব্যাট করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে সিডনিতে প্রথমবার টি-টুয়েন্টি মাঠে গড়ায়। খেলাটিতে আগে ব্যাট করা অজিরা ২২১ রান করেছিল। ভেন্যুটিতে সর্বাধিক দলীয় স্কোরের সেই রেকর্ডটি এখনো টিকে আছে।
দলীয় সর্বনিম্ন রানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। চলতি বিশ্বকাপে এই মাঠেই সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০১ রানে অলআউট হয় সাকিব আল হাসানের দল। অর্থাৎ, হাই-স্কোরিং নাকি লো-স্কোরিং সেমির দেখা মিলবে, তা বলা মুশকিল। তবে ম্যাচ জয়ে টস রাখতে পারে বড় ভূমিকা।








