এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দঙ্গলবাজি ও প্রশাসনের ভূমিকার নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বা একাডেমিক ফ্রিডম দীর্ঘদিন ধরেই গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শাসক ও ক্ষমতাবানদের চাপ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করার প্রবণতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, জ্ঞানচর্চা এবং পাঠদান।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কে প্রেস টিম থেকে প্রকাশিত এ বিবৃতি জানান।
সংগঠনটি জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে তা ভেঙে পড়ছে উগ্র দঙ্গলবাজদের তৎপরতায়। তারা অভিযোগ করে, বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে ধ্বংস করার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা চলছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন মত প্রকাশ বা ভিন্ন মত পোষণের কারণে শিক্ষকরা হেনস্তা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ধর্মানুভূতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রবণতার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং তাঁকে সমর্থন করায় ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও একই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মোহসীন (সায়েম মোহসীন)।
লায়েকা বশীর ও ড. সায়েম মোহসীন যথাক্রমে সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষক উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান শাখায় প্রথাগত বিশ্বাস ও ধারণার ওপর সমালোচনামূলক প্রশ্ন তোলা একাডেমিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ মতাদর্শগত পার্থক্যের অজুহাতে পরিকল্পিতভাবে একজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে একটি নিন্দনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের মতে, লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, এ ধরনের নজির চলতে থাকলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন চিন্তা ও তর্কবিতর্কের জায়গা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, যার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভাবমূর্তির ওপর।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, লায়েকা বশীর গত ১৭ বছর ধরে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করে আসছেন। তিনি সহকারী রেজিস্ট্রার, বিভাগীয় প্রধান, কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক ক্লাবের উপদেষ্টা, অভিযোগ কমিটির কনভেনারসহ নানা প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। জুলাই আন্দোলনেও তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। অথচ এমন একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে উগ্র একটি অংশের শিক্ষার্থীদের হুমকি ও দঙ্গলবাজি তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বিপন্ন করে তুলেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাকে ‘অগণতান্ত্রিক ও অনভিপ্রেত’ আখ্যা দিয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্ক জানায়, এই ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নীরবতা অত্যন্ত হতাশাজনক। সংগঠনটি মনে করে, আক্রান্ত শিক্ষকদের পাশে না দাঁড়িয়ে প্রশাসন, ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার জন্য অশনি সংকেত।
বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক চার দফা দাবিতে উল্লেখ করে বলেন, অনতিবিলম্বে লায়েকা বশীর ও ড. সায়েম মোহসীনের বিরুদ্ধে দঙ্গল সৃষ্টিকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষাবিরোধী এ ধরনের অপতৎপরতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির হুমকি বন্ধ করে যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে তাঁদের কর্মজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার চেতনা সমুন্নত রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণা রক্ষা করতে হবে।








