এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
এক সময় বাংলাদেশের এলিট ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির দর্শকের কাছে দেশীয় সিনেমা ছিল প্রায় উপেক্ষিত। তারা মুখ ফিরিয়ে থাকতেন বাংলা সিনেমা থেকে, অপেক্ষায় থাকতেন হলিউড, বলিউড কিংবা কোরিয়ান-তামিল ভাষার নতুন ছবির জন্য। কিন্তু কোভিড-পরবর্তী সময়ে দৃশ্যপট বদলেছে।
এখন ঈদ এলে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত—সব শ্রেণির দর্শকই ভিড় করছেন প্রেক্ষাগৃহে। সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে মাল্টিপ্লেক্সে মিডনাইট শো চালু হয়েছে, অগ্রিম টিকিট সোল্ড আউট, ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি—এ যেন বাংলা সিনেমার এক নতুন উন্মাদনা।
চাহিদার তুলনায় হল সংকটের মধ্যে বাংলা সিনেমা নিয়ে হালের এই উন্মাদনা রীতিমত বিস্ময়কর। সিনেমার এই সুবাতাসের মধ্যে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয়মাসে মোট ২২ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ৫টি সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে সফল হলেও, আশ্চর্যের বিষয়, এই ৫টি সিনেমা ই মুক্তি পেয়েছে দুই ঈদ উপলক্ষে। প্রেক্ষাগৃহে ব্যবসায়িকভাবে সফল না হলেও বেশ কয়েকটি সিনেমা দর্শকদের কাছ থেকে পেয়েছে প্রশংসা!
এক নজরে দেখে নিন গত ছয়মাস কী কী সিনেমা মুক্তি পেয়েছে-
৩ জানুয়ারি তানভীর হাসান পরিচালিত ‘মধ্যবিত্ত’ মুক্তি পায়। ১০ জানুয়ারি মুক্তি পায় অনন্য মামুন পরিচালিত ‘মেকআপ’। ১৭ জানুয়ারি আবদুল মান্নান পরিচালিত ‘কিশোর গ্যাং’ মুক্তি পায়। আয়নাবাজীর সাফল্যের প্রায় নয় বছর পর ২৪ জানুয়ারি অমিতাভ রেজা চৌধুরী মুক্তি দেন ‘রিকশা গার্ল’, সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ থাকলেও মুক্তির পর উল্টোচিত্র দেখা যায়, প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি মোটেও সুবিধা করতে পারেনি!
৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় বদিউল আলম পরিচালিত ‘দায়মুক্তি’। ৭ ফেব্রুয়ারি ইকবাল হোসেন চৌধুরী পরিচালিত ‘বলী’ মুক্তি পায়। মনজুরুল ইসলাম মেঘ পরিচালিত ‘ময়না’ এবং অরুণ চৌধুরী পরিচালিত ‘জলে জ্বলে তারা’ মুক্তি পায় ১৪ ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারির এই সিনেমাগুলোও প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে (৩১ মার্চ) মুক্তি পায় ছয়টি সিনেমা। জমে ওঠে বাংলা সিনেমা নিয়ে দর্শক উন্মাদনা! মুক্তির আগে গান-টিজার-ট্রেলারে হুলস্থুল কাণ্ড বেঁধে যায়। এগুলো হলো মেহেদী হাসান হৃদয় পরিচালিত ‘বরবাদ’, শিহাব শাহীন পরিচালিত ‘দাগি’, এম রাহিম পরিচালিত ‘জংলি’, শরাফ আহমেদ জীবন পরিচালিত ‘চক্কর ৩০২’, ওয়াজেদ আলী সুমন পরিচালিত ‘অন্তরাত্মা’, কামরুজ্জামান রোমান পরিচালিত ‘জ্বীন ৩’।
এরমধ্যে শাকিব খান-ইধিকা পাল অভিনীত ‘বরবাদ’ দেশ-বিদেশে রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা করে ইন্ডাস্ট্রি হিট হয়। আফরান নিশো-তমা মির্জা অভিনীত ‘দাগি’ ছবিটি সিঙ্গেল স্ক্রিনে সেভাবে সাড়া ফেলতে না পারলেও সিনেপ্লেক্স, মাল্টিপ্লেক্স থেকে বেশ ভালো ব্যবসা করে ‘ব্লকবাস্টার’ হয়। আরেক সিনেমা সিয়াম আহমেদ-বুবলীর ‘জংলি’ মুক্তির পর ধীর গতিতে আগাতে থাকে। পরে দেশের পর বিদেশেও ফ্যামিলি অডিয়ান্স টানতে সক্ষম হয়। লম্বা রেসের ঘোড়া হওয়ায় ধীরে ধীরে ‘জংলি’ ব্যবসায়িক সাফল্যে পৌঁছুতে সক্ষম হয়ে ব্লকবাস্টার হয়ে ওঠে।
মুক্তির একমাস পর বরবাদ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রিয়েল এনার্জি প্রডাকশন জানায়, তাদের গ্রস কালেকশন ৭৫ কোটি টাকা। ‘দাগি’র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আলফা আই থেকে জানা যায়, ১৬ কোটি টাকা গ্রস কালেকশন হয়েছে এবং ‘জংলি’-টিম জানায় ১০ কোটি ৩ লাখ টাকা গ্রস কালেকশন।
এই তিনটি সুপার হিট ছবির পাশাপাশি ‘চক্কর ৩০২’ বেশ প্রশংসিত হয়। এরমধ্যে ‘অন্তরাত্মা’ ও ‘জ্বীন ৩’ ছবি দুটি অতটা আলোচনায় আসতে পারেনি।
ঈদুল ফিতরের সিনেমাগুলো মাস দেড়েক চাঙা রাখে সিনেমাঙ্গন। এরপর আবার ঝিমিয়ে পড়ে সিনেমা অঙ্গন! ১৬ মে মুক্তি পায় পিপলু আর খান পরিচালিত ‘জয়া আর শারমিন’। ২৩ মে মুক্তি পায় গোলাম রাব্বানী কিশোর পরিচালিত ‘আন্তঃনগর’। দুই ঈদের মাঝামাঝি মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি সিনেমাই মুখ থুবড়ে পড়ে।
ঈদুল আযহায় ৭ জুন মুক্তি পায় ছয়টি সিনেমা। রায়হান রাফী পরিচালিত ‘তাণ্ডব’, তানিম নূর পরিচালিত ‘উৎসব’, সঞ্জয় সমদ্দার পরিচালিত ‘ইনসাফ’, মিঠু খান পরিচালিত ‘নীলচক্র’, সানী সানোয়ার পরিচালিত এশা মার্ডার: কর্মফল, আলোক হাসান পরিচালিত ‘টগর’।
মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই শাকিব খান অভিনীত ‘তাণ্ডব’র এইচডি প্রিন্ট (পাইরেসি) অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে ব্যবসায়িক আঘাত হানে। তবুও সিনেমাটি মাল্টিপ্লেক্সে সর্বোচ্চ শো নিয়ে প্রায় একমাস চলে। মুক্তির ১৭ দিনের মাথায় মাথায় প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল ব্লকবাস্টার ঘোষণা দেন। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ‘তাণ্ডব’র গ্রস কালেকশন প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
পিছন থেকে সামনের সারীতে উঠে আসে তানিম নূর পরিচালিত ‘উৎসব’। সিনেমাটি একমাস পার হলেও এখনও সিনেপ্লেক্সে সর্বোচ্চ শো-এর স্থানে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, ওভারসিস মার্কেটেও ভালো ব্যবসা করতে সক্ষম হয়। ‘উৎসব’ টিম জানায়, ২৯ দিনে মাল্টিপ্লেক্সে গ্রস কালেকশন হয়েছে ৫ কোটি টাকা! ঈদের ছবিগুলোর মধ্যে ব্যবসাসফল না হলেও বেশ প্রশংসিত হয় নারী প্রধান সিনেমা ‘এশা মার্ডার: কর্মফল’।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি বলছে, ঈদের বাইরে ভালো সিনেমার অভাবে দর্শক হলমুখী হন না। দর্শকদের হলমুখী রাখতে হলে ঈদের বাইরেও প্রযোজকদের সিনেমা মুক্তি দিতে হবে, এবং এমন সিনেমা মুক্তি দিতে হবে যা দর্শক গ্রহণ করেন। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি যদি শুধু দুই ঈদ কেন্দ্রিক হয় তাহলে সেটা টিকে থাকা সম্ভব নয়।
সাধারণ সম্পাদক আওয়াল হোসেন বলেন, এই জুলাই থেকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আদৌ ভালো সিনেমা পাবো কিনা ঠিক নাই। সিনেমা না থাকলে হলগুলো টিকবে কীভাবে? এখন দেশের যে অবস্থা বাইরের সিনেমা আমদানিও হয়তো সম্ভব হবে না। বিগত কয়েক বছর দেখেছি, ঈদ ছাড়া এমন সব সিনেমা মুক্তি পায় যা দিয়ে সিনেমা হলে লাভ তো দূরে মেইনটেইন কস্ট উঠে আসে না। কাজেই আমরা বারবার বলছি, আপনারা ঈদের সময় একাধিক সিনেমা মুক্তি দিয়ে প্রতিযোগিতায় না নেমে বছরের অন্যান্য সময় ভালো প্রচারণা করে মুক্তি দিন, দর্শক হলে আসবে।
দেশের সর্বাধুনিক সিনে থিয়েটার স্টার সিনেপ্লেক্সের চেয়ারম্যান মাহবুব রহমান বছর দুয়েক আগে একাধিকবার বলেছেন, ভালো স্টোরি টেলিং এবং সিনেমাটোগ্রাফি ভালো হলে ঈদ ছাড়াও যে কোনো সময় ছবি চলে। ঈদে ছবি মুক্তি দিলেই যে ভালো চলবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। নির্মাতা এবং প্রযোজক তাদের বলছি, ভালো ছবি বানিয়ে ঈদ ছাড়া মুক্তি দিন। এর আগে ‘হাওয়া’ ঈদ ছাড়াই খুব ভালো চলেছে। সঠিকভাবে প্রচারণা করে ঈদ ছাড়া ছবি মুক্তি দিতে হবে। কারণ মার্কেটিং ছাড়া মানুষকে না জানিয়ে ছবি ভালো ফলাফল আশা করা মুশকিল। অনেকে ভালো ছবি বানালেও মার্কেটিং করে না।
স্টার সিনেপ্লেক্সের বিপণন কর্মকর্তা মেজবাহ আহমেদ বলেন, বিগত কয়েক বছর যাবত দুই ঈদ এলে দর্শকরা পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে এসে সিনেমা দেখেন। এটা বাংলা সিনেমার সুদিন ফেরার গ্রিন সিগন্যাল। এভাবে চলতে থাকলে বন্ধ হলগুলো আবার চালু হবে, সিনেমার ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠবে। এই ধারাবাহিকতা ঈদের বাইরেও থাকা উচিত। ঈদের বাইরে বাংলা সিনেমা না থাকলে আমাদের হলিউড চালাতে হবে।








