মার্শাল আর্ট হিসেবে শাওলিন কুংফুটা বেশ প্রাচীন। ১৫০০ বছরের পুরনো এ আত্মরক্ষার কৌশল বৌদ্ধ ধর্মের দর্শন থেকে এসেছে। একইসঙ্গে শাওলিন কুংফু হয়ে উঠেছে ক্রীড়া ইভেন্ট। এটির মূল আন্তর্জাতিক ফেডারেশন স্পেনে অবস্থিত।
শাওলিন উডাং মূলত টেম্পলের কুংফু। এই কুংফুতে পূর্ণ বৈচিত্র্য বোঝায়। ঐতিহ্যবাহী চীনা ধর্ম তাওবাদ পালনকারীরা উডাং ও যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তারা শাওলিন কুংফু করে থাকেন।
বাংলাদেশেও হচ্ছে শাওলিনের প্রচলন। বর্তমানে বাংলাদেশ উডাং কুংফু ও উডাং কুংফু ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন মোহাম্মাদ রেজাউল করিম। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ শাওলিন উডাং কুংফু অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ও কোচের দায়িত্বেও আছেন।
আত্মরক্ষার কৌশল রপ্তের পাশাপাশি এটি শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি আনে। প্রতিদিন একঘণ্টা ধরে কেউ এটি করলে শরীরে হজম শক্তি ভালো থাকবে। শারীরিক পরিবর্তন আসবে। ডায়াবেটিসের মতো নানা ধরনের রোগ থেকে নিজেকে রাখা যাবে মুক্ত।
গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে মোহাম্মাদ রেজাউল করিম জানালেন, ‘এটা শিখতে তেমন খরচ নেই। সামান্য খরচেই আমরা শেখাই। ভর্তি ১ হাজার ও মাসিক ১ হাজার করে নেই। ঢাকার বাইরে সবাই ৬০০ টাকা করে দেয়। ইতিমধ্যে ৫ জেলা আমি ছড়িয়ে দিয়েছি। প্রতিমাসে আমার একবার করে ঢাকার বাইরে যাওয়া হয়। সেখানে আমি ইন্সট্রাক্টর তৈরি করছি। ইচ্ছা আছে ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে দেবো।’

‘কেউ খেলতে যেতে চাইলে আন্তর্জাতিক যেকোনো গেমসে খেলতে পারবে। শাওলিন ইউরোপিয়ান অলিম্পিকে স্বীকৃত। ইউরোপে যেকোনো গেমস হলে আমাদের মাধ্যমে যেতে পারবে। আমি বাংলাদেশ মার্শাল আর্ট কনফেডারেশনের সদস্য। আমরা বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিয়েও যেতে পারব।’
‘আমাদের আরেকটা চমৎকার সান্ডা ইভেন্ট আছে। কুংফুর পাশাপাশি করা হয়। সান্ডা এখন রিং ফাইটের মতো। চীনে অনেক জনপ্রিয়। ইউরোপ ও সারাবিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সান্ডা চ্যাম্পিয়নশিপ হয়, সেখানেও খেলতে পারবে।’
‘যেকোনো বয়সী মানুষ এটা করতে পারে। আমাদের ষাটোর্ধ্ব ছাত্রও আছে, যারা শারীরিকভাবে উপকার পাচ্ছেন। বাতের ব্যথা থেকে নিরাময় হচ্ছে। অনেকের সাইনোসাইটিস ভালো হয়ে গেছে। মূল কথা হল, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায়। বাচ্চাদের নিয়মানুবর্তিতা তৈরি করে। শাওলিন কুংফুতে ৭২টা স্টাইল আছে। উডাংয়ে ৮০-এর উপরে স্টাইল।’

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে রেজাউল বললেন, ‘ঢাকার বাইরে সবার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। আমাদের কিছু সমস্যা আছে, ভালো একাডেমি নেই। কলাবাগান মাঠে ২০ বছর আমারই হয়ে গেছে কুংফু অনুশীলন করি। এরকম পরিচ্ছন্ন মাঠ খুব কম পাওয়া যায়। অভিভাবকরা চায় পরিচ্ছন্ন মাঠে সন্তানদের দিতে। বড় বাধা হচ্ছে মেয়েদের নিয়ে। মেয়েদেরকে ওরা কোথাও উন্মুক্ত স্থানে অনুশীলন করতে দিতে চায় না। কমিউনিটি সেন্টারের মতো ভালো একটা রুম দরকার হয়। এগুলোর ব্যবস্থা হলে ঢাকাতে আরও ছড়াতে পারবো। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জে চলছে। রাজশাহীতে চিন্তা করছি চালু করব।’
‘আগামী বছর ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে নেপালে কুংফু চ্যাম্পিয়নশিপে যাব। এবছর নভেম্বর ১৫-১৮ তারিখের মধ্যে জাতীয় পরিষদে কনফেডারেশনের অধীনে বাংলাদেশে একটা জাতীয় গেমস করব। ইতিমধ্যে চারবার জাতীয় পর্যায়ে হয়েছে। পঞ্চমটা করব। যারা কুংফু খেলে থাকে সবাই আমন্ত্রিত। জাতীয় পর্যায়ে যারা ভালো করবে, তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেপালে চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে যাবে।’
সারাদেশে বর্তমানে মোট পাঁচ ব্রাঞ্চে ১৫০ শিক্ষার্থী আছেন। কিশোরগঞ্জে ৭০ জনেরও বেশি। ঢাকায় ২০-২৫ জন নিয়মিত কলাবাগান মাঠে অনুশীলন করেন। স্কুল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে উডাং কুংফু ফেডারেশনের সেক্রেটারির কণ্ঠে ছিল আক্ষেপের সুর।

‘অনেক স্কুলের সাথে কথা বলেছি। তাদের কিছু আপত্তি আছে। বর্তমান পড়াশোনার যে ধারা চলছে, তাতে ছেলে-মেয়েরা সময় পাচ্ছে না। চট্টগ্রামে বড় একটা স্কুল আছে। সেখানকার টিচার আমাকে ডেকেছিল। আমাকে একঘণ্টা সময় দেন সকালে অথবা স্কুল শেষে। উনি বললেন স্কুলের পরে কোচিং তারপর বাসায় হোমওয়ার্ক। এত পড়ার চাপ ছেলেপেলে ফুটবল খেলার সময় পাচ্ছে না। আমরা কুংফু কীভাবে করাব। তবে বুদ্ধি দিয়েছেন যারা জুনিয়র আছে, প্রাথমিক ক্লাসে পড়ে, তাদের দিয়ে শুরু করতে পারেন।’
‘আমাদের ছেলে-মেয়েরা অনেকটা মোবাইল আসক্ত হয়ে গেছে। ফেসবুক আসক্ত হয়ে গেছে। আসক্তি থেকে দূরে রাখার জন্যে কুংফুটা হচ্ছে একটা ক্রিয়েটিভ মার্শাল আর্ট। এটার মধ্যে নতুনত্ব আছে। একঘেমেমি নাই। একটার পর একটা স্টেপ আসে। দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়া। যদি কেউ ৭-৮ বছর ধরে অনুশীলন করে, সারাজীবন সুস্থ থাকতে পারবে। এজন্যই এটা আমাদের সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা। আমি ১৯৯১ সাল থেকে অনুশীলন করি। অনেক উপকার পেয়েছি। আমার এখন ৪৩ বছর চলছে। আমার ফ্রেন্ডরা আমাকে নিয়ে বলে যে এখনো নীরোগ আছি আরকি। আমি চাই বাংলাদেশের সব মানুষ এটা শিখুক। সব বাবা-মায়েরা অনুপ্রাণিত হয়ে যেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।’
উশু ফেডারেশনের সঙ্গে শাওলিন উডাং কুংফু অ্যাসোসিয়েশনের রয়েছে দ্বন্দ্ব। এতে করে শাওলিন পাচ্ছে না পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষক। অর্থের জোগানে যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় বাধা। রেজাউল করিম বিষয়টি নিয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করলেন।

‘এটার উপকারিতা কী, জাতীয় পর্যায়ে সরকারকে আমরা এখনো বোঝাতে পারিনি। সরকারের কাছে একটাই চাওয়া, ওনারা কোনো ক্লাবকে বাদ না দিক। আমাদেরকে লক্ষ্য করে বলে, ওদেরকে নেয়া যাবে না। উশু ফেডারেশন সরাসরি বলে আমরা বেয়াদব। অশিক্ষিত লোকজন দিয়ে ফেডারেশন চালানো যায় না। ওরা বোঝে না কে কীভাবে কাজ করছে।’
‘আমি আজকে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে তারা এসে বাধা দেবে। অনুদানের জন্য কোনো গ্রুপ অব কোম্পানিকে রাজি করালে ওরা চিঠি দিয়ে সেটা বন্ধ করে দেয়। এসব কারণে আমাদের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আকুল আবেদন, কুংফুটা বিখ্যাত করার জন্য আপনাকেই দরকার। আশেপাশে যাদের রেখেছেন, তারা পারবে না।’
‘তারা কুংফু জানে না, প্রশিক্ষণ দিতেও পারে না। তারা কেউ ইউটিউব দেখে করাচ্ছে। ওদের ওইখানে কোচ নাই। চাইনিজ কোচ দরকার। গুরুমুখী শিক্ষায় গুরুকে দরকার। আমরা মাস্টারের কাছে শিখে এসেছি। মিডিয়াতে যাই না। আমরা যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি, তাদের একটা ক্রাইটেরিয়ার ভেতর এনে সম্মানী দেয়া হোক, ভাতা দেয়া হোক।’








