১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে ক্রীড়াঙ্গনে প্রমীলা অ্যাথলেটের মধ্যে অন্যতম সফল নামটি ছিল শামীমা সাত্তার মিমু। বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে রেখে গেছেন অনন্য সাফল্য। সাবেক এ অ্যাথলেট ছিলেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যাথলেট, বিকেএসপির সাবেক প্রশিক্ষক ও সংগঠক। ৬৬ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মিমু। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
শুক্রবার রাত ১১টায় ঢাকায় নিজ বাসভবনে মারা গেছেন তিনি। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে দিনাজপুরে পিতার কবরের পাশে শনিবার দাফন করা হবে। তার মৃত্যুর খবর এবং দাফনের তথ্য জানিয়েছেন একমাত্র পুত্র শাহরিয়ার শরীফ। নিজ জেলা দিনাজপুরে দাফনের জন্য মরহুমার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
মৃত্যুর আগে রেখে যান বেশ সফলতম একটি ক্যারিয়ার। জাতীয় অ্যাথলেট শামীমা সাত্তার মিমুর স্প্রিন্ট, হার্ডলস, হাইজাম্প, লংজাম্প সবখানেই সক্রিয় ছিলেন। তবে হাইজাম্প ইভেন্টে হয়ে উঠেছিলেন বেশ জনপ্রিয়। জাতীয় পর্যায়ের এই ইভেন্টের লড়াইয়ে টানা ষোলোবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য এক রেকর্ড ছিল এ সাবেক অ্যাথলেটের। ৯২ সালে দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অ্যাথলেটিক্সের লড়াই থেকে বিদায় নেন মিমু। এরপর বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস্ করপোরেশনের (বিটিএমসি) অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়ে ৯৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ৯৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) কোচ ছিলেন তিনি। ২০০২ সালে বিকেএসপির উপপরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর বিকেএসপি থেকে অবসরে যান।
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে ক্রীড়াঙ্গনে প্রমীলা অ্যাথলেট হিসেবে মিমু ছিলেন সবার পরিচিত নাম। স্বাধীনতার পরপর ৭৩ সালে ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে জাতীয় পর্যায়ের লড়াইয়ে আগমন ঘটেছিল মিমুর। একই বছর দিনাজপুর জেলাতে অনুষ্ঠিত জেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার, লংজাম্প এবং ট্রিপল জ্যাম্পে তিনি প্রথম হন। এরপর দিনাজপুর জেলা একাদশের পক্ষে জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে অংশগ্রহণ করার জন্য তাকে নির্বাচিত করা হয়। ৭৩ সালে কেবল ১৩ বছর বয়সে নিজ জন্মস্থান দিনাজপুর জেলা একাদশের পক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় ক্ষুদে অ্যাথলেট হিসেবে অনশগ্রহন করেন মিমু।
কৈশোরে অ্যাথলেট সুলতানা কামাল, হামিদা বেগম, শামীম আরা টলিদের বিপক্ষে লড়াই করে কিশোরী মিমু সেসময় নতুন আভা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে দিনাজপুর থেকে আসা এই কিশোরী সূচনাতেই চমকে দিয়েছিলেন লং জাম্পে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। সেই ইভেন্টে প্রথম হয়েছিলেন শেখ মুজিবর রহমানের পুত্রবধূ অ্যাথলেট সুলতানা কামাল। একই বছরে ১০০ মিটার স্প্রিন্টারে এবং হার্ডলসে তিনি তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। ১০০ মিটারে প্রথম হয়েছিলেন শামীম আরা টলি। দ্বিতীয় হয়েছিলেন সুলতানা কামাল।
খেলা থেকে অবসরের পর বিটিএমসির ম্যানেজার, এবং এরপর আবারও ক্রীড়ার সাথে যুক্ত হন তিনি। অ্যাথলেট তৈরির অদম্য বাসনায় কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। কয়েক বছর পর যোগ দেন এনএসসিতে। এনএসসির অ্যাথলেট কোচ হিসেবে তিনি দারণ দক্ষতা দেখান। অবশ্য এর আগেই ভারতের পাতিয়ালা থেকে কোচিংয়ের ওপর ডিপ্লোমা সমাপ্ত করেন। উচ্চতরো প্রশিক্ষণ নেন জার্মান থেকেও। তার দক্ষ কোচিংয়ের কারণেই ৯৬ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মহিলা ইসলামিক গেমসে সে সময়কার যুঁথি, ফিরোজা, নিলুফাররা কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করতে সক্ষম হন। টানা আট বছরের কোচিং জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০০২ সালে মিমু দিনাজপুর বিকেএসপিতে উপ-পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।
ম্যানেজার এবং কোচ হিসেবেও তার সাফল্য অনেক। ২০১৬ সালে ভারতের গোহাটি-শিলংয়ে অনুষ্ঠিত ১২তম এসএ গেমসে তিনি বাংলাদেশ দলের মহিলা টিম ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় আসরে তার অবদানে বাংলাদেশের মেয়েরা অনন্য অর্জন এনেছিলেন দেশের জন্য। রাতদিন পরিশ্রম করে তিনি নারী অ্যাথলেটদের উজ্জীবিত ও উৎসাহিত করেছিলেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে। সাহস ও পরামর্শ দিয়েছিলেন সবসময়। যার ফলাফলও তিনি দেশবাসীকে সাফল্য উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসএস গেমস থেকে শীলা, মাবিয়ারা সেবার দেশের জন্যে যে দারুণ সাফল্য বয়ে এনেছিলেন। সেই সাফল্যের নেপথ্যের তিনি ছিলেন অন্যতম একজন।
দীর্ঘ ক্রীড়া জীবন আর চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গৃহেই ব্যস্ত ছিলেন মিমু। কিন্তু তবুও তার মন পড়ে থাকে সেই মাঠে, রানিং ট্র্যাকে। মাঠ থেকে একদম দূরে সরে যাননি কখনও। শেষ পর্যন্ত সম্পৃক্ত ছিলেন আর্চারি ফেডারেশন এবং মহিলা ফুটবলের সাবকমিটির সাথে। অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনে বারো বছর ধরে সদস্যও ছিলেন তিনি।


