রাশিয়ার মস্কো শহরের কেন্দ্রস্থলে রোসআটম অ্যাডিটিভ টেকনোলজিসের উচ্চ-নিরাপত্তা গবেষণা কেন্দ্রে নীরবে চলছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ভবিষ্যতের রকেট, নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর এমনকি জটিল যন্ত্রাংশ নির্মাণের ধরনই বদলে দিতে পারে এই প্রযুক্তি।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এখানেই দাঁড়িয়ে আছে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ইলেকট্রন বিম ৩ডি প্রিন্টার। এটি শুধুমাত্র ছাপায় না, এটি টাইটেনিয়ামকে গলায়, কাটাকুটি করে, এবং জটিল যন্ত্রাংশে রূপ দেয় যা স্পেস মিশন ও পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরে ব্যবহৃত হয়। রাশিয়া বর্তমানে অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং বা জনপ্রিয়ভাবে পরিচিত এই ৩ডি প্রিন্টিং।
রোসআটমের অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের পরিচালক ইলিয়া ভ্লাদিমিরোভিচ কাভেলাশভিলি বলেন, এই ৩ডি প্রিন্টারগুলো এতটাই উন্নত যে টাকা ছাড়া সবকিছুই ছাপাতে পারে কারণ কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকই টাকা ছাপে।
এই বিপ্লবী প্রযুক্তির অংশ হতে যাচ্ছে ভারতও। রাশিয়ার এই বিশালাকৃতির ইলেকট্রন বিম ৩ডি প্রিন্টারটি শিগগিরই ভারতে পাঠানো হবে, যদিও এর অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে।
ভারতের একাধিক সংস্থা ইতোমধ্যেই রুশ কোম্পানির সঙ্গে প্রায় ১৫০ কোটি রুবল যা প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা মূল্যের বহু বছরের সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
যে প্রিন্টারটি ভারতে আসছে, তার দাম প্রায় ২০ কোটি টাকা।
কাভেলাশভিলি জানান, এই রুশ প্রযুক্তি ভারতেই নির্মাণ শুরু করবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ আহ্বান অনুযায়ী।
এই প্রিন্টারে টাইটেনিয়াম বা স্টেইনলেস স্টিলের সাধারণ তার ব্যবহার করে অত্যন্ত জটিল যন্ত্রাংশ তৈরি করা যায়, যা সাধারণ লেদ মেশিন দিয়ে করা প্রায় অসম্ভব। অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং-এর মূল কৌশল হলো লেয়ার-বাই-লেয়ার ভিত্তিতে ডিজিটাল ব্লুপ্রিন্ট অনুসারে বস্তু তৈরি করা।
পারস্পারিক পদ্ধতিতে ধাতব বস্তু কেটে বা ঘষে আকার দেওয়া হয়। এতে সময় লাগে, বর্জ্য বেশি হয়, এবং জটিল ডিজাইন সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে, ৩ডি প্রিন্টিং-এ উপকরণ নষ্ট হয় না, এবং দিন থেকে মাস নয়, এখন দিনের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যায় প্রোটোটাইপ।
লেজার মেল্টিং এবং ইলেকট্রন বিম মেল্টিং-এর মতো প্রযুক্তি দিয়ে মাইক্রোস্কোপিক স্তরে ধাতব কণাকে গলিয়ে তৈরি করা হয় যন্ত্রাংশ, যা বেশি টেকসই, কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং উচ্চ তাপমাত্রায় টিকে থাকতে সক্ষম যা স্পেস ও নিউক্লিয়ার প্রকল্পে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
২০২০ সালে এই প্রযুক্তিকেন্দ্রের উদ্বোধনে রোসআটমের মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ বলেন, রাশিয়ায় এটিই প্রথম এমন কেন্দ্র, যা সম্পূর্ণ রুশ প্রযুক্তি ও সফটওয়্যারে চলতে সক্ষম।
ভারত ও রাশিয়া বহু বছর ধরেই কৌশলগত মিত্র। তবে এই প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এক নতুন স্তরে নিয়ে যাচ্ছে এই সম্পর্ককে।
কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের মহাকাশ যাত্রা যেখানে হয়তো রাশিয়ায় প্রিন্ট করা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করবে ভারতীয় রকেট এই অংশীদারিত্ব আর শুধু লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং রূপ নিচ্ছে রূপান্তরমূলক বন্ধনে।
রোসআটমের এই প্রযুক্তিকেন্দ্র কেবল যন্ত্রাংশ নয়, ছাপাচ্ছে ভরসা, উদ্ভাবন, এবং এক যৌথ ভবিষ্যতের ভিত্তি।








