ঈদে মুক্তি পাওয়া ৫টি বাংলা ছবির মধ্যে বেশ ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও কানন ফিল্মস প্রযোজিত রায়হান রাফীর সিনেমা ‘প্রেশার কুকার’। সিনেমাটি দেখে নিজেদের মুগ্ধতার কথা জানাচ্ছেন দর্শক। ‘প্রেশার কুকার’ দেখে নিজের অনুভূতি লিখে জানালেন নির্মাতা ও লেখক আলভী আহমেদ। চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য তার লেখাটি হুবুহু নিচে তুলে ধরা হলো:
সিনেমায় প্রধান কোনো চরিত্র নেই। সুনির্দিষ্ট কোনো গল্প নেই। কী আছে তাহলে? অনেকগুলো চরিত্র পাবেন এখানে, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। তাদের আলাদা গল্প, নিজস্ব পরিবার, বিচিত্র জীবন। কিন্তু আসলেই কি তারা বিচ্ছিন্ন? যোগাযোগ কি একেবারেই নেই?
আছে। তারা নিজেরা জানে না। কিন্তু আমরা জেনে যাই, কারণ আমরা ক্যামেরার চোখে দেখি। দর্শক হিসেবে আমরা বুঝে ফেলি যে চরিত্রগুলো কানেকটেড হতে যাচ্ছে।
এই ছেঁড়া ছেঁড়া বিচ্ছিন্ন গল্পগুলো একটু একটু করে সুতোয় গাঁথা হয় এবং সবার অগোচরে ধীরে ধীরে একক গল্প হয়ে ওঠে। হাইপারলিংক স্টোরি কাকে বলে জানতে চাইলে রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’ দেখে নিতে পারেন।
প্রায় তিন ঘণ্টার ছবি। এত বড় ছবিতে দর্শককে ধরে রাখা কষ্ট। হয় হিউমারের আশ্রয় নিতে হয়, নাহয় থ্রিল আনতে হয়, নয়তো অন্য কোনো আগডুম বাগডুম… এই ছবি যে কী দিয়ে আমাকে বেঁধে রাখল সেটাই বুঝে উঠতে পারিনি। তিন ঘণ্টা শেষে শুধু এটুকু ফিল করেছি যে এক সেকেন্ডের জন্যও বোর হওয়ার সুযোগ পাইনি।
সিনেপ্লেক্সের রিক্লাইনার চেয়ারে শুয়ে শুয়ে ছবিটা দেখছিলাম। একটা দৃশ্য ছিল এরকম, নাজিফা তুষি আর ফজলুর রহমান বাবু প্রাইভেট কারের ভেতরে বসা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন শহীদুজ্জামান সেলিম। তিনি তাঁদের গাড়ির ড্রাইভার। তুষি আর শহীদুজ্জামান সেলিম চোখ দিয়ে যাচাই করে নিচ্ছেন পরস্পরকে। ঠাণ্ডা সাপের মতো দৃষ্টি তাঁদের। কোনো ডায়লগ নেই দৃশ্যে। কিন্তু সেই দৃষ্টি বিনিময় এত মারাত্মক যে উত্তেজনায় চেয়ারে বসে পড়লাম। এরকম অসংখ্য দৃশ্যের কথা বলা যায়।
শহীদুজ্জামান সেলিমকে এই সিনেমায় দেখে মনে হয়েছে, তিনি জন্ম থেকেই যক্ষার রোগী, কখনো খুক খুক করে, কখনো আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে কাশেন। সারাজীবনে ড্রাইভারি ছাড়া আর কিছু করেননি। বদরাগ ছাড়া অন্য কোনো ব্যবহার তার কাছ থেকে এক্সপেক্ট করা যায় না। এমন ট্রু টু দ্য ক্যারেকটার, ফ্যান্টাস্টিক!
আর তুষি? এমনভাবে যে সে নিজেকে ভাঙতে পারে, কল্পনাও করিনি কখনো। এ কথা সত্যি যে চিত্রনাট্যে তাঁর সুযোগ ছিল বেশি। কিন্তু ফুলটস বল পেলেই যে ব্যাটার ছয় মারতে পারবে, এটা নিশ্চিত কিছু নয়। তুষি সুন্দরভাবে মাঝ ব্যাটে বল লাগিয়েছে।
ফজলুর রহমান বাবু ভাই দারুণ। আজিজুল হাকিম চেনা রূপে নয়। চঞ্চল চৌধুরী ওয়াজ আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! জানতাম না যে তিনি আছেন এই সিনেমায়। আর এই লোক যে দৃশ্যে থাকেন, সেই দৃশ্যের সবটুকু আলো নিজের দিকে টেনে নেন।
ছবির সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ। তবে প্রজেকশন বা ডিসিপি কনভার্সনের ঝামেলা, অথবা নিতান্তই আমার চোখের সমস্যার কারণে দৃশ্যগুলো একটু সফট ফোকাস মনে হয়েছে। শার্পনেসের অভাব। হতে পারে, সেটা এনামরফিক লেন্সে শ্যুট করার কারণে।
গান এবং বিজিএম? ব্রিলিয়ান্ট। ‘বড়াই করে’ গানটা মাথার মধ্যে লুপের মতো করে বেজেই চলেছে। ‘প্রেশার কুকার’ দেখে সত্যিই প্রেশারে পড়ে গেলাম। মনে মনে খুঁজতে লাগলাম, সাম্প্রতিক সময়ে এরচেয়ে ভালো বাংলা ছবি কয়টা দেখেছি? খুব বেশি পেলাম না।
ছবির কিছু কি অপছন্দ হয়নি? হয়েছে। তবে ঠিক অপছন্দ বলব না। বরং এভাবে বলা ভালো যে মনে হয়েছে যে কোথাও কোথাও গল্পটা দিশা হারিয়েছে। যেমন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার মেয়েটার গল্প। ওই মেয়ে কেন শুরুতে আছে, মাঝখানে দুই ঘণ্টা নেই কেন, আবার শেষে কেন আছে, এর কোনো উত্তর পাইনি। সে সিনেমায় না থাকলেও বা কী ক্ষতি হতো, সেটাও একটা প্রশ্ন।
যাই হোক, অসাধারণ এবং অভিনব এই চেষ্টার জন্য পরিচালককে ধন্যবাদ। আমরা মুগ্ধ হওয়ার জন্য তৈরি। আরও মুগ্ধ হতে চাই সামনে। এমন ব্যতিক্রমি প্লট নিয়ে আসবেন আবার।
কলকাতার আর্ট হাউজ সিনেমার চেয়ে রায়হান রাফীর এই সিনেমা অনেক বেশি পাওয়ারফুল। কারণ এরমধ্যে আঁতলামি কম, জীবন বেশি।








