অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একটি সুদূরপ্রসারী সংস্কারমূলক রূপরেখা তুলে ধরেন। ভাষণটি ছিল নতুন আশা, উদ্যম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে পরিপূর্ণ।
ভাষণের মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল- নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংস্কার, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সংস্কার প্রক্রিয়ার সূচনা, গত ১৫ বছরে সব অপকর্মের বিচার স্বল্পমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংলাপ ও ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠা। তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকেও আলোকপাত করেন, যেখানে একটি দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন রূপরেখা প্রণয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বিগত সরকারের অপকর্মের বিচার প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, কেবল জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডই নয়, আমরা গত ১৫ বছরে সব অপকর্মের বিচার করবো। অসংখ্য মানুষ গুম হয়েছে, খুন হয়েছে এই সময়ে। আমরা গুমের তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেছি। কমিশন প্রধান আমাকে জানিয়েছেন অক্টোবর পর্যন্ত তারা ১,৬০০ গুমের তথ্য পেয়েছেন। তাদের ধারণা এই সংখ্যা ৩,৫০০ ছাড়িয়ে যাবে। অনেকেই কমিশনের কাছে গুমের অভিযোগ করতে ভয় পাচ্ছেন এই ভেবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা তারা আবার আক্রান্ত হতে পারেন, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আপনারা দ্বিধাহীন চিত্তে কমিশনকে আপনাদের অভিযোগ জানান। কারো সাধ্য নেই আপনাদের গায়ে আবার হাত দেয়।
তিনি বলেছেন, অভিযুক্ত যতই শক্তিশালী হোক, যে বাহিনীরই হোক তাকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেবল দেশে নয়, গুম, খুন ও জুলাই-আগস্ট গণহত্যার সাথে জড়িতদের আমরা আন্তর্জাতিক আদালতেও বিচারের উদ্যোগ নিয়েছি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের প্রধান কৌশলী করিম খানের সঙ্গে আমার এ ব্যপারে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে।
তিনি ভাষণে আরও বলেন, কঠিন এই সময়ে আপনারা সবাই অপরিসীম ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছেন। ধন্যবাদ জানাই দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে। তারা তাদের কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রতিশোধ স্পৃহায় লিপ্ত হয়ে কেউ যাতে হানাহানিতে জড়িয়ে না পড়ে সেই আহ্বান জানিয়েছেন।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি তুলে ধরেন নানান পদক্ষেপের কথা। তিনি বলেন, মানুষ যাতে স্বল্প মূল্যে কৃষি পণ্য কিনতে পারে সেজন্য রাজধানীসহ বিভিন্ন স্পটে সরকারি কিছু পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। টিসিবির মাধ্যমে ১ কোটি নিম্ন আয়ের ফ্যামিলি কার্ডের মধ্যে ৫৭ লাখকে স্মার্ট কার্ডে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বন্যার ফলে চালের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। আসন্ন রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও দাম যাতে স্বাভাবিক থাকে এজন্য সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত বৈঠক করে যাচ্ছে। দ্রব্য মূল্য নিয়ে আমাদের কোনো লুকোছাপা নেই। মূল্যস্ফীতির পূর্ণ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি রোধে উচ্চ সুদের হার নির্ধারণসহ একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে শস্য আমদানিতে এলসি সীমা অপসারণ এবং সরবরাহ চেইন সংক্ষিপ্ত করা।
নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথাও ভাবতে হচ্ছে। আপনারা সবাই জানেন, আমাদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যদিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মতামত নিয়ে যাচ্ছি। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব মতামত অনেকাংশে প্রতিফলিত হচ্ছে। চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিটি মতামত সক্রিয় ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি চাকরিতে বয়স বাড়ানো কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি মেনে ইতোমধ্যে সরকারি চাকুরির বয়স সীমা ৩২-এ উন্নীত করা হয়েছে। আমরা জানি আমাদের কাছে আপনাদের আরো অনেক দাবি-দাওয়া আছে। দীর্ঘ দিনের অপশাসন, অত্যাচার, অনাচারের ফলে আপনাদের মনে অনেক ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। দেশে বাক স্বাধীনতা না থাকায় আমরা কেউ আমাদের মতামত, দাবি-দাওয়া প্রকাশ করতে পারিনি। আমরা আপনাদের প্রতিটি দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল। আমরা ধৈর্য্য সহকারে আপনাদের কথা শুনতে চাই। কিন্তু সেজন্য আপনারা সড়ক অবরোধ করে জন দুর্ভোগ সৃষ্টি করলে আমাদের সকলেরই অসুবিধা হয়। আমাদের একান্ত অনুরোধ আপনারা নির্দিষ্ট চ্যানেল মেইনটেইন করে আপনাদের দাবি দাওয়া পেশ করবেন।








