ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বুধবার(১১ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গণমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট এই তথ্য জানায়।
বিশ্ববিষয়ক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আসলে কার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন?
সম্প্রতি ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে এ বছরের প্রথম ফোন আলাপের পরই এই নতুন ইঙ্গিত সামনে আসে। ক্রেমলিনের দাবি, হোয়াইট হাউস থেকেই এই ফোনকলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লাভবান করতে পারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কে।
তেলবাজারের দিকে নজর রেখে ট্রাম্প প্রথমে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ “শিগগিরই শেষ হতে পারে” এবং এটি “প্রায় সম্পূর্ণ”। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই তিনি আবার বলেন, যুদ্ধ চলবে, কারণ “আমরা এখনও যথেষ্ট জিতিনি”।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পরিস্থিতি পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলা চালানো হতে পারে এবং ইরান যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে তাকে “ভয়াবহ পরিণতি” ভোগ করতে হবে।
এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার পরিকল্পনা করছেন।
তিনি বলেন, “আমরা কিছু তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করছি যাতে দাম কমে। কিছু দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে সেগুলো আপাতত তুলে নেওয়া হতে পারে যতক্ষণ না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে।”
তিনি দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেননি, তবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি রাশিয়া এবং ভারতের ও চীনের কাছে তাদের তেল রপ্তানির প্রসঙ্গই ইঙ্গিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রি করে রাশিয়া বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করছে।
এক বছর আগে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাদের দেশকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
এদিকে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। কারণ রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া যদি পূর্ণ সক্ষমতায় তেল রপ্তানি শুরু করতে পারে, তাহলে ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিলে অন্তত ৫০ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানে বড় সহায়তা দেবে।
পাশাপাশি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, রাশিয়ার গোয়েন্দারা ইরানকে লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেছে। সেই তথ্য ব্যবহার করে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, যেখানে অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্যেও প্রভাব ফেলে।
এদিকে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক ঘাঁটি ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যেও ইরানে সামরিক অভিযান নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, কারণ তিনি আগে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে রাশিয়াকে সহায়তা না করেও তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে পারে। রাশিয়ার বাইরে থাকা বৈশ্বিক তেল মজুতই বিশ্ব চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট শুক্রবার বলেন, রাশিয়ার তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাশিয়ার বিনিয়োগ বিষয়ক বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছেন বলে জানান।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ওলেকসান্ডার মেরেজকো বলেন,“ট্রাম্প যদি সত্যিই ইউক্রেনে শান্তি চান, তাহলে রাশিয়াকে তেল আয় থেকে বঞ্চিত করাই একমাত্র উপায়। কারণ সেই আয়ই রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্র চালায়।”
তার মতে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে তা রাশিয়ার সামরিক শক্তিকে আরও বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়াবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একই সময়ে ইউক্রেন নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক ড্রোনের কিছু অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে।
সমালোচকদের মতে, এই বাস্তবতা উপেক্ষা করেই ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল অবস্থান নিচ্ছে।








