ভালোবাসার জন্য বিয়ের খবর প্রচলিত হলেও ‘ভালো বাসা’ পেতে অধ্যাপক দিলারা হাফিজের সাথে বর্তমান স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের বিবাহবন্ধন ও দাম্পত্য জীবন শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানফেরত সিনিয়র অফিসাররা চলে আসলে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বাসা বরাদ্দ নাও পাওয়া যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় সেসময় মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বিয়ের হিড়িক পড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে দিলারা হাফিজের সাথে মেজর হাফিজের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
নিজের আত্মজীবনী ‘সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর’ বইয়ে এমন তথ্য জানিয়েছেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।
মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, বিয়ের আগে ভালোবাসার কথা সবাই জানে, কিন্তু ভালো বাসার জন্য বিয়ে! হিড়িক পড়ে গেল। প্রতি সপ্তাহেই দু’তিনটি বিয়ের দাওয়াত পেতে লাগলাম। যাদের সঙ্গে আমার ওঠাবসা, সবাই ফটাফট বিয়ে করে ফেলেন। সিনিয়র অফিসারদের জন্য নির্ধারিত শহীদ আজিজ পল্লীর বৃহদায়তন ৩ বেডরুমের বাসাগুলো এরাই বরাদ্দ পেলেন এবং মহা উৎসবের সাথে বিবাহিত জীবনের সূত্রপাত ঘটালেন। আমি এসময় প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। পল্টনের ব্যাচেলর অফিসারকূল আমার কুমার জীবনের অবসান ঘটাতে উঠেপড়ে লাগলেন।

তিনি বলেন, কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন ইকবালের বাড়ি সুনামগঞ্জে। তার বোন দিলারা ইডেন গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক। ইকবালের কোর্সমেট ক্যাপ্টেন নূর প্রধান ঘটক হিসেবে ঘটনা ঘটানোর জন্য তৎপরতা শুরু করলেন। বরিশালে বসবাসরত আমার পরিবার বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। অবশেষে বিয়ের ফুল ফুটল এবং প্রথম দেখা পাত্রী দিলারাকেই বিয়ে করতে সম্মত হলাম। লাড্ডু দিল্লীর হোক কিংবা সুনামগঞ্জের, খেলেও পস্তাতে হবে, না খেলেও। সুতরাং খেয়ে পস্তানোই ভালো।
মেজর (অব.) হাফিজ জানান, সেকালে বিয়ের কার্ডসহ দরখাস্ত করলেই সেনা সদর বাসা বরাদ্দ করত। আমিও বিয়ের সপ্তাহখানেক আগেই শহীদ আজিজ পল্লীতে বন্ধুদের প্রতিবেশী হলাম।
তিনি বলেন, ১৭ আগস্ট ১৯৭২। হোটেল পূর্বাণীতে বিয়ের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হলো। বিয়ের বরযাত্রীরা অনেকেই ছিলেন খ্যাতিমান মানুষ। যেমন: জেনারেল ওসমানী, জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ, মীর শওকত, আবুল মনজুর, জিয়াউদ্দিন প্রমুখ।

এছাড়া সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরের পর মেজর হাফিজ যখন প্রতিকূল সাংসারিক জীবন পার করেছিলেন, তখনও পাশেই ছিলেন সহধর্মিণী দিলারা হাফিজ। পরবর্তীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও ইডেন কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক হয়েছিলেন অধ্যাপক দিলারা হাফিজ।
প্রচারবিমুখ খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ দিলারা হাফিজ শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঈদুল ফিতরের দিন দুপুরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় এবং সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন অধ্যাপক দিলারা হাফিজ।


