অবরোধ ও হরতালের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের পাইকারি এবং খুচরা ব্যবসাগুলো, তন্মধ্যে কৃষি বাণিজ্য অন্যতম। কারণ কৃষি পণ্য পচনশীল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কৃষিজ পণ্য উৎপাদন স্থান থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানো না গেলে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায় বা পচে যায়। ফলে কৃষকরা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধর্মঘটের ফলে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা লক্ষ্য করা যায়।
ধর্মঘটের ফলে দোকানপাট খোলা থাকলেও জনসাধারণের মনে ভীতি কাজ করে বিধায় জনসমাগম কম থাকে। বিক্রেতারা জানান, দেশের জনসাধারণ চলমান হরতাল ও অবরোধকে উপেক্ষা করছে। দিন বাড়ার সাথে সাথে দুর্বৃত্তরা বাসে আগুন দিতে শুরু করে, লোকেরা তাদের নিরাপত্তার জন্য একেবারে প্রয়োজনীয় না হলে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকে।
প্রতি অবরোধ ও হরতালের ফলে জিডিপির গড় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অবরোধ ও হরতালের ফলে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় দেশে পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সংকটের ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতি এই ধরনের ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি বহন করতে পারে না। বাংলাদেশ এখনও তার অর্থনীতিতে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব থেকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
অধিকন্তু, বাজারের মূল্যস্ফীতি উচ্চ রয়ে গেছে। এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে, হরতাল ও ধর্মঘটের প্রভাব দেশের অর্থনীতির উপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি একটি গোষ্ঠী সহ্য করতে পারে না বিধায় তারা হরতাল-অবরোধের মত সহিংসতাপূর্ণ কর্মসূচি দিয়ে দেশের অর্থনীতির ‘বিরাট ক্ষতি’ সাধন করছে।
রাজনীতির নাম ভাঙ্গিয়ে যারা দেশের সম্পদ ও জনগণের ক্ষতি করছে তাদেরকে জনগণের স্বার্থে এরূপ কর্মসূচি থেকে বিরত থাকা উচিত। বাংলাদেশে বিগত ১৫ বছরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ছিল, যার ফলে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। যার সুফল দেশের জনগণ ভোগ করছে। কিন্তু বর্তমানে হরতাল অবরোধের মতো অর্থনৈতিক ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের কৃষি বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর এবং এসএমই খাত।
পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যা আমদানিকারক এবং রপ্তানিকারক উভয়কেই ইতোমধ্যেই সংকটজনক অবস্থায় ফেলেছে। ধর্মঘট এবং অবরোধ বাস এবং ট্রাকের মতো পরিবহনের উপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাব ফেলছে। কারণ এগুলো ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পণ্য সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহণের বিকল্প খুঁজে না পাওয়ায় কৃষি বাণিজ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ঝুঁকির কারণে পরিবহন ভাড়া দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের জনগন বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের শ্রেণী বর্তমানে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে জীবনযাত্রার চরম সংকটে।
চলমান ধর্মঘট ও অবরোধের কারণে এটি আরও বেড়েছে যার ফলে পরিবহণের ভাড়া আকাশচুম্বী হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরও বেড়েছে। সমগ্র সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে, কারণ আমদানিকারকরা বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য আনতে পারছেন না, অন্যদিকে রপ্তানিকারকরা তাদের পণ্য ফ্যাক্টরি থেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য বিমান ও সমুদ্র বন্দরে সরবরাহ করা কঠিন হচ্ছে।
বড় বড় শপিংমল থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও পাইকারি ব্যবসায়ী, সকলের-ই বিএনপি-জামায়াতের অবরোধের ফলে ব্যবসায়িক মন্দা দেখা দিয়েছে। ফলে পণ্য বিক্রয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। হরতাল ও অবরোধের ফলে সারাদেশে কৃষি বাণিজ্যের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
হরতাল বা অবরোধের ফলে প্রতিদিন অর্থনীতিতে ক্ষতি হয় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসার পক্ষ থেকে, বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতির উপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব বিবেচনা করে সব রাজনৈতিক দলকে হরতাল ও অবরোধের মতো অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকার প্রয়োজন।

নির্বিচার সহিংসতা অব্যাহত থাকলে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে অর্থনীতিতে তার ব্যাপক বিরুপ প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে হরতাল ছোট ব্যবসার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে। স্থবির হয়ে পড়েছে ছোট ব্যবসা বাণিজ্য।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে যদি ধর্মঘট, অবরোধ এবং সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পায় তা কৃষি অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব ফেলবে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ফলে অভ্যন্তরীণ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মঘট ও অস্থিরতার ফলে দুর্বল রপ্তানি ও বিনিয়োগের কারণে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে।
ধীর প্রবৃদ্ধি কৃষি এবং পরিষেবা খাতের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। যদিও প্রাথমিকভাবে স্থবির খাদ্যশস্য উৎপাদনের কারণে কৃষি উৎপাদন দুর্বল হয়েছে, ধর্মঘট এবং রাজনৈতিক সহিংসতার সরাসরি প্রভাবের কারণে পরিষেবা খাতের বৃদ্ধি বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সম্ভাব্য হরতাল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলছে তা দেশের জনসাধারণ প্রত্যক্ষভাবে অনুধাবন করছে।
ধর্মঘট ও হরতালের ফলে যে সহিংসতা হচ্ছে তা অতীতের ন্যায় বর্তমানেও ব্যবসা এবং কৃষি অর্থনীতিতে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলছে। রাজনীতি হোক জনগণের জন্য। সাধারণ জনসাধারণকে জিম্মি ও তাদের জীবন জীবিকার উপর হস্তক্ষেপ কোনভাবেই কাম্য নয়। অর্থনীতি ধ্বংসকারী এসব হরতাল ও অবরোধ পরিহার করে জনগণকে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সচল রাখার জন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
দেশের জনগণ মুক্তভাবে ও ভয়-ডরহীন চলাফেরা করতে পারুক এটা আমাদের সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য কৃষি বাণিজ্যের প্রসার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধ্বংসাত্বক কর্মকাণ্ড পরিহার করে সকলকে জনগণের পাশে থাকার মাধ্যমেই দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








