অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মৃত্যু ঘিরে রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য—কিন্তু সেগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই যেন বেশি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন শুটিং ইউনিটের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা এমনকি অভিনেতা যে হোটেলে ছিলেন, সেখানকার কর্মীরাও। কিন্তু এসব জেরায় উঠে আসা তথ্যগুলো একত্র করলে স্পষ্ট চিত্র পাওয়ার বদলে বরং বিভ্রান্তিই বাড়ছে।
ঘটনাটি ঘটে রবিবার বিকেলে, তালসারি সমুদ্রতটে। তখন ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল। বিকেলের আলো-আঁধারিতে রাহুল জলে নামেন। এখানেই প্রথম প্রশ্ন- তিনি কি শুটিংয়ের প্রয়োজনে জলে নেমেছিলেন, নাকি শটের বাইরে গিয়ে?
পরিচালক ও সহ-অভিনেতাদের দাবি, দৃশ্যের অংশ হিসেবেই তিনি জলে ছিলেন। তবে ইউনিটের অন্য একটি অংশের বক্তব্য, তখন শুটিং প্রায় শেষের পথে ছিল। এই দ্বৈত বক্তব্যই তদন্তের শুরুতেই তৈরি করছে ধোঁয়াশা।
রাহুলকে উদ্ধার নিয়েও দ্বন্দ্ব। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, সহঅভিনেত্রীকে নিয়ে জলে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই আচমকা গভীরতা বেড়ে যায় এবং ভারসাম্য হারিয়ে তলিয়ে যান রাহুল। সহ-অভিনেত্রী কোনওভাবে ফিরে এলেও তাকে আর সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়নি।
এখানেও রয়েছে মতভেদ। কেউ বলছেন দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছিল, আবার স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ সময় তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার প্রমাণ মিলেছে। ফুসফুস, খাদ্যনালি ও পাকস্থলীতে পাওয়া গেছে বালি ও নোনা জল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি দ্রুত উদ্ধার করা হয়ে থাকে, তাহলে এত পানি শরীরে ঢুকল কীভাবে?
তদন্তকারীরা একাধিক সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছেন। সমুদ্রতলের হঠাৎ গভীর গর্তে পা পিছলে যাওয়া, জোয়ারের স্রোতের টান, চোরাবালি বা অনিরাপদ সি-বেড- দুর্ঘটনার সমস্ত কারণই খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হঠাৎ গভীরতা বেড়ে যাওয়াই হতে পারে মূল কারণ, তবে এখনও নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি যা থেকে রাহুলের আচরণে অস্বাভাবিকতা বোঝা যায়। অর্থাৎ, তিনি স্বাভাবিক অবস্থাতেই ছিলেন।
এদিকে পুরো ঘটনায় বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এত বড় শুটিং ইউনিট থাকা সত্ত্বেও সেখানে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড বা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না কেন- তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। শুটিংয়ের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনায় সরব হয়েছে অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন। তাদের অভিযোগ, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং নিরাপত্তা গাফিলতির ফল।
সব মিলিয়ে, তদন্ত এগোলেও এখনও স্পষ্ট কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রত্যেক নতুন তথ্য যেমন কিছুটা আলোর দিশা দেখাচ্ছে, তেমনি নতুন করে তৈরি করছে আরও প্রশ্ন।








