নববর্ষ বরণের উৎসব পয়লা বৈশাখ সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোনো ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা না থাকলেও উৎসবকে ঘিরে যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে লক্ষ্যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে পুলিশ।
এ বছর গোয়েন্দা সংস্থাসহ সব নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা দেওয়া হবে নগরবাসীকে। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন উপলক্ষে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর ও হাতিরঝিল এলাকাসহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উৎসব ঘিরে কোনো সুনির্দিষ্ট হুমকির তথ্য না থাকলেও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকবেন। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে।
রোববার পুলিশ সদরদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, নববর্ষ উদযাপন ঘিরে জনসমাগম বেশি হয় এমন স্থানগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রমনা বটমূল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, হাতিরঝিলসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে থাকবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি, যাতে সবাই নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।’’
গত শুক্রবার পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে রাজধানীতে নিরাপত্তা তৎপরতার অংশ হিসেবে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় যৌথ টহল কার্যক্রম চালায় ডিবি এবং সিটিটিসি। সেসময় ডিএমপির কেনাইন ইউনিট ব্যবহার করা হয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশদ্বারের সন্দেহভাজন বাস ও মাইক্রোবাস থামিয়ে চেক করা হয়। পহেলা বৈশাখ উদযাপন নির্বিঘ্ন করতে এই অভিযান বলে জানান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
বাংলা নববর্ষকে ঘিরে ডিএমপি সম্মেলন কক্ষে এক সমন্বয় সভায় ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। প্রতি বছরের মতো এবারও পহেলা বৈশাখে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা ধরণের অনুষ্ঠান পালন করা হবে। বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবারের অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি অনেক বেশি হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটবে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। ডিএমপির পক্ষ থেকে পুলিশকে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রমনা বটমূল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিং করা হবে।
ডিএমপি জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে ফানুস উড়ানো, আতশবাজি ফুটানো, গ্যাস বেলুন ও ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ৩০০ ফিট এলাকায় মোটরসাইকেল বা কার রেসিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। রমনা বটমূল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিং করা হবে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ওয়াচ টাওয়ার, সিসি ক্যামেরা এবং পর্যাপ্ত আর্চওয়ে থাকবে। ইভটিজিং, ছিনতাই ও পকেটমার রোধে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে।
ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কোনো হুমকি বা ঝুঁকির শঙ্কা নেই। তবু নববর্ষ ঘিরে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের নিয়মনীতি
নববর্ষের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তবে মুখোশ হাতে নিয়ে বহন করা যাবে। প্রদর্শনীর জন্য তৈরি মুখোশ এমনভাবে প্রদর্শন করা যাবে না, যাতে মুখ ঢেকে থাকে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের শুরুতেই যোগ দিতে হবে। মিছিল শুরুর পর মাঝপথে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। সাধারণ মানুষ ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, দিয়াশলাই বা লাইটার বহন করতে পারবে না। এ ছাড়া বিজ্ঞাপনী স্টিকার বহন করে বৈশাখী শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ না করা, শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে চারুকলা ইনস্টিটিউটের স্বেচ্ছাসেবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং রোভার স্কাউট সদস্যদের পরামর্শ মেনে চলা, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তু পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিক নিকটস্থ পুলিশকে অবহিত করা এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রবীন্দ্র সরোবর, রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ সব উন্মুক্ত স্থানের অনুষ্ঠান সমাপ্ত করতে হবে।
নিরাপত্তার স্বার্থে যেসব নিষেধাজ্ঞা
ডিএমপি জানিয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি ফোটানো, গ্যাস বেলুন ও ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০০ ফিট এলাকায় মোটরসাইকেল বা কার রেসিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১৪ এপ্রিল ঢাবির মেট্রোরেল স্টেশন নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ থাকবে। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর বিশ্ববিদ্যালয় স্টিকারবিহীন কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।
এদিকে, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও সাজানো হয়েছে নতুনভাবে। জনসমাগম বেশি হবে এমন এলাকাগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, উৎসব চলাকালে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে। এছাড়া ব্যাগ, ব্যক্তিগত সামগ্রী ও শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, শঙ্কা না থাকলেও সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এবারও বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ উদযাপনের অপেক্ষায় দেশবাসী।







