আউটসোর্সিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশদ ধারণা না থাকার কারণে বর্তমানে নানা রকমের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আউটসোর্সিং কি এই সম্পর্কে আউটসোর্সিং এর সেবা সরবরাহকারী ও সেবা কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।
সাধারণত আউটসোর্সিং বলতে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব কাজ বা সেবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার মাধ্যমে করিয়ে নেয়াকে বুঝায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুক্তির মাধ্যমে দুইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজের মেয়াদ, প্রকৃতি ও পারিশ্রমিকের বিষয়টি নির্ধারণ করে নেয়া হয়।

আউটসোর্সিং এর বিষয়টি মোটেও নতুন কোন ধারণা নয়। হাজার বছর ধরে এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে কাজ সম্পাদন করে আসছে। জানা যায়, প্রাচীন মিশর, চীন, মেসেপোটেমিয়া ও রোম সভ্যতায় এর অস্তিত্ব ছিল। প্রাচীন মিশরে পিরামিড নির্মাণে বিভিন্ন কারিগর, স্থপতি ও শ্রমিকদেরকে কাজের দায়িত্ব দিতেন, যা এক ধরণের “আউটসোর্সিং”। এছাড়া, মিশরের বস্ত্র, স্বর্ণকার ও কৃষিজ পণ্যের উৎপাদনও প্রায়ই বিভিন্ন অঞ্চল বা পেশাজীবী গোষ্ঠীকে দিয়ে করানো হতো। সম্রাটেরা অনেক সময় বেসরকারি ব্যবসায়ী ও কারিগরদের দিয়ে রেশম উৎপাদন, অস্ত্র নির্মাণ ও রাস্তা নির্মাণের কাজ করাতেন। রোমান সেনাবাহিনী ও প্রশাসন অনেক সময় বেসরকারি ঠিকাদারদের দিয়ে সড়ক, সেতু, জলাধার ও সামরিক সরবরাহের কাজ করাত। বর্তমান বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশ বিশেষত উন্নত বিশ্বগুলোর সরকার অনেক সেবাকে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে সম্পাদন করে আসছে।

আউটসোর্সিং এর মূলত শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের সময়। তখন এটি কন্ট্রাক্ট ম্যনেফাকচারিং নামে পরিচিত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো তাদের সহায়ক কাজ বাইরের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান দিয়ে করাতে শুরু করে। তবে বর্তমানে বিশ শতকে শেষ ভাগে দেশগুলোতে আউটসোর্সিং আধুনিক রুপে বিকাশ লাভ করেছে। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং বা আইটি আউটসোর্সিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং সাধারণত পদোন্নতি বিহীন কাজগুলোকে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে গ্রহণ করার পদ্ধতিটি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে।
আউটসোর্সিং প্রক্রিয়া জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। এর মাধ্যমে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যয় হ্রাস করা ও দ্রুততার সাথে কাজ সম্পাদন করা সম্ভব। ফলে সংস্থাটি তার মূল কাজের প্রতি মনোযোগ দেয়ার যথেষ্ট সময় পায়। বিগত বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উল্লেখযোগ্য হারে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঊনিশশো আশির দশকে যুক্তরাজ্যে থ্যাচার সরকারের সময় থেকেই “নিউ পাবলিক ম্যানেজমেন্ট (এনপিএম)” সংস্কারের অংশ হিসেবে আউটসোর্সিং জনপ্রিয়তা লাভ করে। যুক্তরাজ্যে সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা সহায়ক কাজ, আইটি সেবা, কারাগার ব্যবস্থাপনা, ও জনপরিবহন আউটসোর্সিং করে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে যুক্তরাজ্যের সরকারি খাতের সেবা ও পণ্য ব্যয়ের ২৯ শতাংশ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে করা হয়েছে।

একটি জরিপে দেখা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এজেন্সিতে তিন ধরনের আউটসোর্সিং প্রক্রিয়া প্রচলিত রয়েছে। বাজেট সীমাবদ্ধতা, নতুন প্রযুক্তি, জনবল সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি প্রেক্ষাপটে এজেন্সিগুলো “কন্ট্র্যাক্ট পার্সনেল”, “শেয়ারড সার্ভিসেস”, “বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও)” ইত্যাদি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে কন্ট্র্যাক্ট পার্সনেল, প্রায় ৮৬শতাংশ এজেন্সি “কন্ট্র্যাক্ট পার্সনেল” ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া সিংগাপুর, ভারত, আস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আউটসোর্সিং ব্যাপক হারে ব্যবহার করে থাকে। এর মূল উদ্দেশ্য জনগণের উপরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপ হ্রাস করা। প্রকৃতপক্ষে সরকারের প্রতিটি ব্যয় জনগণের অর্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। এই উদ্দেশ্যকেই সামনে রেখে আধুনিক রাষ্ট্রের সরকার আউটসোর্সিংকে উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে থেকে বাংলাদেশ সরকারও উন্নত বিশ্বগুলোকে অনুসরণ করে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণকে উৎসাহিত করছে। মূলত রাজস্ব ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যেই এবং দ্রুত ও স্বল্প সময়ে সেবা সরবরাহ করার জন্য এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে বিগত কয়েক দশকে সরকারি খাতে বিপুল পরিমাণে পদ সৃজন ও জনবল নিয়োগের করা হয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, ২০০৮ সাল হতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সৃজিত পদের সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ ১১ হাজার ৫০০টি। এতে করে জনগণের উপরে কর আরোপের পরিমাণ ও একই সাথে উন্নয়ন পরিকল্পনা চলমান রাখার জন্য বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। যা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ। জনগণ ও রাষ্ট্রকে এই চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের জন্যই মূলত আউটসোর্সিং প্রক্রিয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের আউটসোর্সিং
বাংলাদেশের সরকারি খাতে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ বিষয়টি অপেক্ষাকৃত নতুন। বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণের জনপ্রিয়তা ও স্বল্প সময়ে দ্রুততার সাথে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণের শুরু করা হয়। এ উদ্দেশ্যে অর্থবিভাগ থেকে ২০০৮, ২০১৮ এবং ২০২৫ সালে পরপর তিনটি নীতিমালা প্রনয়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং পাবলিক প্রসিউরমেন্ট রুল অনুসরন করে সেবা গ্রহণ করা হয়। এ নীতিমালার মাধ্যমে সাধারণত সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, খাবার সরবরাহ, বাগান পরিচর্যা, হাসপাতাল গুলোতে আয়া-ওয়ার্ড বয় সেবাগুলো আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সংগ্রহকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
বৈষয়িক অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে এবং আধুনিক সরকারের ধারনায় পরিবর্তনের ফলে আউটসোর্সিং ও চুক্তিভিত্তিতে সেবা গ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থবিভাগ সূত্রে জানা যায়, আউটসোর্সিং প্রক্রিয়াকে সুস্থভাবে সম্পাদনের জন্য কর্মীরা যাতে তাদের প্রাপ্য মূল্য হতে বঞ্চিত না হয়, সে উদ্দেশ্যে অর্থ বিভাগ মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একই সাথে এই অর্থ যেন সেবা প্রদানকারীদের নিজ নামে ব্যাংক একাউন্টে জমা দেওয়া হয় সে উদ্দেশ্যে নীতিমালা জারি করা হয়েছে। বর্তমান নীতিমালায় তাদের সুযোগ-সুবিধা আরো বৃদ্ধিসহ পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
সমস্যার কারণ কি ও সমাধানের উপায়
কিন্তু বর্তমান সময়ে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন রকমের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মূলত সেবাদান কর্মীদেরকে সময় মতো পারিশ্রমিক না দেওয়া, পারিশ্রমিকের কিছু অংশ কেটে নেয়া, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়া বা রাজস্ব খাতে চাকুরী দেওয়ার মিথ্যা প্রলোভন দেখানো, চাকরি দেওয়ার নাম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ প্রভৃতি অভিযোগ দেখা যাচ্ছে। এটা পরিষ্কার হওয়া জরুরী যে আউটসোর্সিং অন্যান্য চাকরির মতন কোন চাকরি নয়। এটা শুধুমাত্র কিছু সেবা চুক্তির মাধ্যমে করিয়ে নেওয়া বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি এবং এসব চাকরি রাজস্ব খাতে হস্তান্তরের কোন সুযোগ নেই। বরং অনেক রাজস্ব খাতে চাকরি হয়তো ধীরে ধীরে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় চলে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবার একই সাথে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ার বিলুপ্তকরণের বিষয়ে অনেকেই মতামত প্রকাশ করছেন। সমস্যাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত না করে সমস্যার মূলকারণ খুঁজে বের করে তা সমাধান করা প্রয়োজন। বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কতিপয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, যার সত্যতা যাচাই করে ঠিকাদেরই প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল করা আবশ্যক। একই সাথে যেসব কর্মীগণ তাদের সেবামূল্য পাননি তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ আত্মসাৎ চিহ্নিত করে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে কয়টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে, সেসব ঠিকাদারদেরই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আর সংঘটিত হবে না। একই সাথে সেবাকর্মীদেরও তাদের ন্যায্য পাওনা পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







