ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামে তীব্র ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এক পর্যায়ে ১৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে যায়। পরে তা আবার বেড়ে প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর পেছনে ভূমিকা রাখে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটের একটি পোস্ট, যেখানে তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দাবি করেছিলেন যে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে একটি তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করিয়েছে। তবে তিনি পরে সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন।
এরপর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো সশস্ত্র নিরাপত্তা দিয়ে জাহাজ পার করানো হয়নি। ইরানের হুমকির কারণে ওই প্রণালী কার্যত আঞ্চলিক নৌ চলাচলের জন্য বন্ধ হয়ে আছে।
বুধবার (১১ মার্চ) ভোরে তেলের দাম আবারও কমতে শুরু করে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বৈশ্বিক সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল মজুত ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এই খবর প্রকাশের পর জিএমটি সময় রাত ২টা নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের নিচে অবস্থান করছিল।
তবে দামের এই ওঠানামা সত্ত্বেও, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করার আগের সময়ের তুলনায় তেলের দাম এখনো প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি রয়েছে। হামলার আগে এক পর্যায়ে দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাক তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। কারণ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ তেল মজুত হয়ে যাচ্ছে এবং সংরক্ষণ ক্ষমতাও দ্রুত কমে আসছে।
ইরানের সামুদ্রিক মাইনের আশঙ্কা
তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এতে দৈনন্দিন পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৪ শতাংশ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.১৫ শতাংশ কমে।
যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মূল্যসীমা নির্ধারণ এবং রেশনিংয়ের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, প্রয়োজন হলে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে মার্কিন নৌবাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এই পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কারণ ওই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক জাহাজ আটকে আছে এবং ইরানের উপকূল থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিও রয়েছে।
মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ট্রাম্প তেহরানকে প্রণালীতে মাইন না বসানোর সতর্কবার্তা দেওয়ার পর হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের ১৬টি মাইন স্থাপনকারী জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধ কতদিন চলবে এ নিয়েও ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে, যা জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি বলেন, শত্রু সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর মার্কিন হামলা বন্ধ হবে না এবং এখনো যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
শিল্পবিষয়ক প্রকাশনা রিগজোনের প্রেসিডেন্ট চ্যাড নরভিল আল জাজিরাকে বলেন, সাধারণত বিশ্লেষকেরা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করলেও অধিকাংশ সময় তা কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে থাকে।
তিনি বলেন, এই সপ্তাহে আমরা দেখেছি বাজার অল্প সময়ের জন্য হলেও সেই ঝুঁকিকে বাস্তব হিসেবে ধরে নিয়ে সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা অনুযায়ী দাম পুনর্নির্ধারণ করেছে।
নরভিল আরও বলেন, একটি মাত্র তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করানো সরবরাহের সামগ্রিক সমীকরণ বদলে দেয় না। প্রতিদিন সাধারণত শতাধিক জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। বাজার এখন মূলত দেখতে চাইছে, তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ আবার আগের মতো চালু হতে পারে কি না।








