ওয়ানডে বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দাপট, বীরের মতো একের পর এক ম্যাচ জিতে সেমিফাইনাল। তারপর দাপটেই ফাইনালে। এমন কথা এবার কেবল ভারতকে নিয়েই বলা যাচ্ছে। রোহিত শর্মার অপরাজিত ভারত। শিরোপার মঞ্চে আসতে শক্তি-সামর্থ্যের সব রূপই যেন দেখিয়েছে টিম ইন্ডিয়া। বাকি শুধু ক্যানভাসে রং-তুলির শেষ আঁচড়ের। রোববার বাংলাদেশ সময় দুপুর আড়াইটায় আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে হবে শেষের মহারণ।
লিগপর্বে প্রতিটি ম্যাচেই রোহিতের দল নিজেদের মতো করেই সাজাতে পেরেছিল চিত্রনাট্য। বাইশ গজে ব্যাট হাতে বইয়ে দিয়েছে রানবন্যা। ব্যাটিংবান্ধব পিচে বোলারদের গলায় বারবার উঠেছে উইকেটের মালা। একযুগ অপেক্ষার পর ক্রিকেটের বৈশ্বিক আসরে আরেকটি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার অপেক্ষায় স্বাগতিক ভারত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফাইনাল মহারণের আগে জেনে নেয়া যাক কোন পথ মাড়িয়ে শিরোপার এককদম দূরে পৌঁছেছে ভারত।
ফাইনালের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে খেলতে নেমেছিল টিম ইন্ডিয়া। স্বাগতিক বোলারদের দাপটে একদিনের ক্রিকেটে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ১৯৯ রানে গুটিয়ে যায়। সহজ লক্ষ্য তাড়ায় ২ রানে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটার হারিয়ে বিপদে পড়েছিল ভারত। এমন পরিস্থিতিতে বিরাট কোহলি ও লোকেশ রাহুলের ১৬৫ রানের জুটি ৬ উইকেটে জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।
দ্বিতীয় ম্যাচে আফগানিস্তানের দেয়া ২৭৩ রানের লক্ষ্য সহজেই পেরিয়ে যায় রোহিতবাহিনী। ব্যাট হাতে রোহিত করেন সেঞ্চুরি। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ফিফটির দেখা পান কোহলি। ভারত পায় ৮ উইকেটের সহজ জয়।
পরের ম্যাচে আহমেদাবাদে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ব্যাট হাতে বড় স্কোরের সম্ভাবনা জাগিয়েছিল। ব্যাটিং বিপর্যয়ে মাত্র ৩৬ রান যোগ করতে শেষ ৭ উইকেট হারায় বাবর আজমের দল। ১৯১ রানে হয় অলআউট। ভারত ১১৭ বল হাতে রেখে ৭ উইকেটের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
পুনেতে ভারতের বিপক্ষে টসে জিতে ব্যাটিং নিয়েছিল বাংলাদেশ। দলকে উড়ন্ত সূচনা দিয়েছিলেন ফিফটি পাওয়ার দুই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও লিটন দাস। ৯৩ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর ভারতীয় বোলাররা ম্যাচে ফেরে। টিম টাইগার্সকে ৮ উইকেটে ২৫৬ রানের বেশি তুলতে দেয়নি। বিরাট কোহলির অপরাজিত সেঞ্চুরিতে ভর করে ৭ উইকেটের অনায়াস জয়ে মাঠ ছাড়ে ভারত। ম্যাচে চোটে পড়া হার্দিক পান্ডিয়া পরে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে যান।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টা অবশ্য খুব সহজে ধরা দেয়নি। আগে ব্যাট করা কিউইরা ড্যারেল মিচেলের সেঞ্চুরি ও রাচীন রবীন্দ্রর ফিফটির কল্যাণে অলআউট হওয়ার আগে জমায় ২৭৩ রান। হার্দিকের ইনজুরির সুবাদে একাদশে এসেই বাজিমাত করেন মোহাম্মদ শামি, নেন ৫ উইকেট। টিম ইন্ডিয়া দুই ওভার হাতে রেখে ৪ উইকেটে জেতে। কোহলির ৯৫ রানের ইনিংসটির ছিল বড় ভূমিকা।
গত আসরের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে ব্যাটিংয়ে ভারত মোটেও সুবিধা করতে পারেনি। মাত্র ৪০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে। রোহিত শর্মা ৮৭ রানের ইনিংস খেলেন। সূর্যকুমার যাদব ও লোকেশ রাহুলের কার্যকরী মাঝারি ইনিংসে স্বাগতিকরা ৯ উইকেটে ২২৯ রানের পুঁজি পায়। বোর্ডে অল্প রান সঙ্গী করে টিম ইন্ডিয়ার অগ্নিঝরা বোলিংয়ের সামনে ইংলিশরা ১২৯ রানে গুটিয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ করে। জস বাটলারের দল ১০০ রানের শোচনীয় পরাজয় দেখে।
পরের ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলায় মাতে ভারত। আগে ব্যাটিংয়ে নেমে জমায় ৮ উইকেটে ৩৫৭ রানের বিশাল সংগ্রহ। ২০ ওভারের আগেই লঙ্কানরা মাত্র ৫৫ রানে অলআউট হয়ে যায়। ৩০২ রানের জয়ে প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালের টিকিট কেটে ফেলে ম্যান ইন ব্লু। প্রথম চার ম্যাচে না খেলা শামি বল হাতে ঝলসে উঠে নেন ৫ উইকেট।
টুর্নামেন্টে সমীহ জাগানিয়া দল সাউথ আফ্রিকাকেও বিশ্বআসরে দুবারের শিরোপাধারীরা দাঁড়াতে দেয়নি। আগে ব্যাট করে তুলে নেয় ৫ উইকেটে ৩২৬ রান। কোহলি ১০১ রানের ইনিংস খেলে একদিনের ক্রিকেটে কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের রেকর্ড ৪৯ সেঞ্চুরি স্পর্শ করেন। পরে রবীন্দ্র জাদেজার স্পিন ঘূর্ণিতে প্রোটিয়ারা হয়ে পড়ে দিশেহারা। মাত্র ৮৩ রানে থামে ইনিংস, হেরে বসে ২৪৩ রানের বিশাল ব্যবধানে। জাদেজা দখলে নেন ৫ উইকেট।
আইসিসির সহযোগী সদস্য নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ভারত আগে ব্যাট করে চারশো রানের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। ৪ উইকেটে ৪১০ রানের বিশাল সংগ্রহে ছিল শ্রেয়াস আয়ার ও লোকেশ রাহুলের সেঞ্চুরি। ডাচরা ২৫০ রানে অলআউট হয়। টিম ইন্ডিয়া পায় ১৬০ রানের জয়। অপরাজিত থেকে গ্রুপপর্ব শেষ করে ভারত।
প্রথম সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ভারত তুলে নেয় ৪ উইকেটে ৩৯৭ রানের বিশাল সংগ্রহ। কিং কোহলি ১১৭ রানের ইনিংস খেলার পথে গড়েন ইতিহাস। শচীনকে টপকে হন ওয়ানডেতে রেকর্ড ৫০টি সেঞ্চুরির প্রথম মালিক। শ্রেয়াস আয়ারও পান শতকের দেখা।
কিউইরা দ্রুত ২ উইকেট হারালেও কেন উইলিয়ামসন ও ড্যারিল মিচেলের ১৮১ রানের জুটিতে বড় কিছুর আশা দেখেছিল। মিচেল ১৩৪ রানের নান্দনিক ইনিংস খেলেন। বাকিরা যোগ্য সঙ্গ দিতে পারেননি। মাত্র ৩২ রানে শেষ ৬ উইকেট হারায় উইলিয়ামসনের দল। ৩২৭ রানে থামে তাদের ইনিংস। ভারত ৭০ রানের জয়ে হাতে পায় ঘরের মাঠের ফাইনালের টিকিট।








