ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েল যদি মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, তাতে তার আপত্তি থাকবে না। তিনি ইহুদি জনগণের ভূমির ওপর অধিকারকে ধর্মীয় ভিত্তিতে সমর্থন করেছেন।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রক্ষণশীল ভাষ্যকার ট্রাকার কার্লসন–এর সঙ্গে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের ভৌগোলিক সীমানা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন হাকাবি। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের সীমানার শিকড় বাইবেলে নিহিত।
কার্লসন বলেন, বাইবেলের একটি আয়াতে আব্রাহামের বংশধরদের জন্য ইউফ্রেটিস নদী (ইরাক) থেকে নীল নদ (মিসর) পর্যন্ত ভূমির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল আধুনিক লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান এবং সৌদি আরবের অংশবিশেষকে অন্তর্ভুক্ত করবে।
এ প্রসঙ্গে হাকাবি বলেন, তারা যদি সবটাই নেয়, তাতেও সমস্যা নেই। গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ইসরায়েলে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন।
হাকাবির বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করে কার্লসন জানতে চান, তিনি কি সত্যিই ইসরায়েলের পুরো অঞ্চল দখলের পক্ষে? জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, তারা দখল করতে চায় না। তারা দখল চাচ্ছে না।
পরবর্তীতে নিজ বক্তব্যকে কিছুটা অতিরঞ্জিত বলে উল্লেখ করে হাকাবি তা থেকে সরে আসার চেষ্টা করেন। তবে ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ইসরায়েলের সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
তিনি বলেন, যদি এসব জায়গা থেকে তাদের ওপর আক্রমণ হয়, তারা যুদ্ধ জিতে সেই ভূমি নেয় তাহলে সেটা আলাদা আলোচনা।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হাকাবির মতের সঙ্গে একমত কি না এ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক আইনে ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং বলপ্রয়োগ করে ভূমি দখলের নিষেধাজ্ঞা মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচিত। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) রায় দেয়, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখল অবৈধ এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
তবে ইসরায়েলের আইনে রাষ্ট্রের সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। সিরিয়ার গোলান মালভূমি ইসরায়েল ১৯৮১ সালে সংযুক্ত করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ বলে বিবেচিত। ওই সিরীয় ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দিয়েছে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধের পর ইসরায়েল লেবাননের অভ্যন্তরে পাঁচটি স্থানে সামরিক চৌকি স্থাপন করে।
ইসরায়েলের কিছু রাজনীতিক, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ, সম্প্রসারিত সীমানাসহ ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন।
২০২৩ সালে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ একটি অনুষ্ঠানে এমন একটি মানচিত্র প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক ক্ষোভের জন্ম দেন, যেখানে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও লেবানন, সিরিয়া এবং জর্ডানের অংশবিশেষকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে দেখানো হয়।
কার্লসনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে হাকাবি দাবি করেন, ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিষ্ঠিত। তবে একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন তদারকি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আইসিজেকে ‘রোগ’ বা পথভ্রষ্ট সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করে সেগুলোর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছেন।
ইসরায়েলের প্রতি তার ধর্মীয় সমর্থনের বাইরে, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত বা কারাবন্দি মার্কিন নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে সরব না হওয়ায়ও হাকাবি সমালোচিত হয়েছেন।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে দণ্ডপ্রাপ্ত গুপ্তচর জনাথন পোলার্ড–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি কিছু রক্ষণশীল মহলের ক্ষোভের মুখেও পড়েন। পোলার্ড যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তথ্য ইসরায়েলকে সরবরাহ করেছিলেন, যার কিছু তথ্য পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতেও পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর সাবেক বেসামরিক বিশ্লেষক পোলার্ড ৩০ বছর কারাভোগের পর ২০২০ সালে মুক্তি পান এবং ইসরায়েলে চলে যান। তিনি তার অপরাধের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেননি। ২০২১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থায় কর্মরত ইহুদিদের ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির আহ্বান জানান।
হাকাবি বলেন, তিনি পোলার্ডের মতের সঙ্গে একমত নন। তবে তাকে আতিথ্য দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কেবল জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, তিনি তার অনুরোধে বৈঠকের জন্য দূতাবাসে এসেছিলেন। আমি সাক্ষাৎ করেছি এবং সত্যি বলতে, এতে আমার কোনো অনুতাপ নেই।
তিনি যোগ করেন, এখানে থাকার সময় আমি অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, ভবিষ্যতেও আরও অনেকের সঙ্গে করব।








