সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো দেশের গুরুত্বপূর্ণ টেলি স্বাস্থ্যসেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’ এখন বন্ধের পথে। দেশের একটি সমন্বিত জাতীয় স্বাস্থ্য–অবকাঠামোয় পরিণত হওয়া বিনামূল্যের এই স্বাস্থ্য পরামর্শসেবা কীভাবে এমন ঝুঁকিতে পড়লো, এর দায় কার- এখন এমন বিস্ময় প্রশ্ন উঠেছে !
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে অর্থসংকট, জনবল সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এই সেবাটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসাধারণের এই সেবা অব্যাহত রাখতে মন্ত্রণালয়ের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
বন্ধ হলে বাড়বে ভোগান্তি
যদি স্বাস্থ্য বাতায়নের সেবা বন্ধ হয়, তা দেশের টেলি স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে। শহর এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন সাবসেন্টারের অভাবে ১৬২৬৩ নম্বরটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার আরও সংকুচিত হবে, বেড়ে যাবে অপ্রয়োজনীয় হাসপাতালে ভিড়।
মানুষ এখানে কল করে ছোট-বড় সব ধরনের সমস্যার সমাধান পান, যা বড় হাসপাতালের সেবা দ্বারা সবসময় সম্ভব হয় না। এছাড়া স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত স্বাস্থ্য পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমাদের জনসাধারণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিকভাবে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে না পারলে জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘ্নিত হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সব বয়সের মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়ন বন্ধ হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে।
তিনি বলেন, এ মুহূর্তে প্রয়োজন সাময়িক সমাধান নয়, বরং স্থায়ী বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির মাধ্যমে জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে টিকিয়ে রাখা। নতুবা ‘ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা’র যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা আরেকটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগের মতোই নীরবে হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় যুক্ত হবে।
সাধারণ জনগণ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত স্থায়ী বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে ১৬২৬৩ সেবাটিকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখার দাবি জানিয়েছেন।
২০২৫ সালে স্বাস্থ্য সেবার ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৩ কল
জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়ন সেবায় সাধারণ মানুষ দিন-রাত যেকোনো সময়ে ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পরামর্শ ও চিকিৎসা নিতে পারেন। এখানে ১০০ জন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক এবং ২৫ জন হেলথ ইনফরমেশন কর্মকর্তা পালাক্রমে সেবা প্রদান করেন। ২০২৫ সালে এখানে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৩টি স্বাস্থ্য সেবার কল রেকর্ড করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বাতায়নে রোগীদের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ ও বিশেষ রোগের চিকিৎসা, কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং জরুরি অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্স ও রক্তের তথ্য সরবরাহ। প্রতিটি কল স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করা হয়। প্রয়োজন অনুসারে রোগীর মোবাইলে ই-প্রেসক্রিপশন পাঠানো হয় এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এই সেবার আওতায় ২০২৫ সালের টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন এ ২৫ হাজারের অধিক মানুষকে তথ্য সেবা সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। ডেঙ্গু, করোনা, এ্মপক্সসহ যেকোনো রোগের প্রাদুরভাবের সময় আইভি আর মেনুতে পৃথক লাইন রাখা হয়, কল ওয়েটিং টাইম কমানোর জন্য।
গড়ে দৈনিক কল আসে ৬,৫০০
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) এর ই-হেলথ কার্যপরিকল্পনার আওতায় স্বাস্থ্য বাতায়ন চালুর পর প্রতিদিন স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ থেকে সেবার তথ্য সরকারকে পাঠানো হয়। মাসিক, ত্রৈমাসিক এবং বার্ষিক প্রতিবেদনও নিয়মিত সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৫,৫০০ থেকে ৬,৫০০ কল আসে। যাত্রা শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ২ কোটি ৭০ লাখের বেশি কল গ্রহণ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষীয় ব্যাখ্যা
দীর্ঘ ১৭ মাস ধরে এই স্বাস্থ্য বাতায়নের জন্য কোনো অর্থ ছাড় করা হচ্ছে না। অন্যদিকে এই কার্যক্রম নবায়নের মেয়াদ চলতি বছরের এপ্রিলে হলেও এখনও সেবা চালু রাখতে নবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’ বন্ধের ঝুঁকিতে, এর দায় কারা নিবে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ মূলত সরকারি উদ্যোগ হলেও এর দৈনন্দিন কার্যক্রম অনেকাংশে প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। নির্দিষ্ট প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ না থাকায় অপারেশন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে কল সেন্টারের জনবল বেতন, প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সার্ভিস আপডেট—সবখানেই চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বাতায়নকে দ্রুত স্বাভাবিক ও চলমান রাখতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন: আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সকল বিষয় জানিয়েছি। আমাদের পরবর্তী অপারেশন প্ল্যান জানিয়েছি। তাদের আমরা চিঠিও দিয়েছি। আশা করছি দ্রুতেই সকল প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠি ও অপারেশন প্ল্যানের বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, কিছু বাস্তব সংকট রয়েছে, তবে সেবাটি পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বিকল্প অর্থায়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য বাতায়নকে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
জাতীয় ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’; এটি সরকারের ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা সহায়তার প্রতীক। অথচ অর্থায়নের অনিশ্চয়তা, প্রকল্পনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি আজ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে। এটি স্পষ্ট করে দেয়—দেশে অনেক নাগরিকবান্ধব উদ্যোগ চালু হলেও সেগুলোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার প্রশ্নে নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা ও দূরদর্শিতা এখনও ঘাটতিপূর্ণ।








