মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এমন একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটির সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় থাকার পথ প্রশস্ত হয়েছে। নতুন প্রক্রিয়ায় তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এবং একই সঙ্গে জান্তা সরকার তাকে সামরিক বাহিনীর প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম এই তথ্য জানিয়েছে।
২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন মিন অং হ্লাইং। তিনি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চিকে আটক করেন এবং তার দলকে বিলুপ্ত করেন, যার ফলে দেশটি গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়। সু চির নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাতের পর থেকেই তিনি কার্যত দেশ শাসন করে আসছেন।
পাঁচ বছরের কঠোর সামরিক শাসনের পর সম্প্রতি সীমিত ও কঠোর নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রতিবাদ বা সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। জানুয়ারির শেষ দিকে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে সামরিকপন্থী দলগুলো সহজ জয় পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাইং মিন খান্ত বলেন, এই রাজনৈতিক কৌশল প্রমাণ করে মিন অং হ্লাইং কঠোরভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান। তিনি আরও বলেন, তার বৈধতার ঘাটতি থাকলেও তিনি ক্ষমতার একটি আনুষ্ঠানিক রূপ ধরে রাখতে মরিয়া।
সোমবার পার্লামেন্টের অধিবেশনে নিম্নকক্ষের এমপি কিয়াও কিয়াও হ্টে মিন অং হ্লাইংকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত করেন। তিনজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন, যাদের একজন পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবেন।
একই অধিবেশনে জান্তাপন্থী ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির কিয়াও সোয়েকে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করা হয়। দলটি মূলত ১৯৮৮ সালের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনের পর সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা গঠিত হয়েছিল।
উচ্চকক্ষ আরও দুইজন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত করে। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন কাচিন রাজ্যের সাবেক বিদ্রোহী নেতা তু জার, যিনি এখন সামরিকপন্থী অবস্থানে রয়েছেন। অন্যজন করেন রাজ্যের এমপি নান নি নি আয়ে, যিনি ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)-এর সদস্য।
গণতন্ত্র পর্যবেক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে নতুন সরকার মূলত সামরিক বাহিনীরই ছায়া সরকার হিসেবে কাজ করবে। সামরিক বাহিনী দেশটির স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ক্ষমতায় ছিল।
সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন
একই দিনে জান্তা সরকার নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ দেয়। সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয় উইন ওকে নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সামরিক বাহিনী।
বিবৃতিতে বলা হয়, আজ থেকে টাটমাদো (মিয়ানমার সেনাবাহিনী)-এর কমান্ডার-ইন-চিফের দায়িত্ব জেনারেল ইয় উইন ও-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সাবেক সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং ভবিষ্যতে রাষ্ট্র, জনগণ ও সেনাবাহিনীর স্বার্থে কাজ চালিয়ে যাবেন বলেও জানানো হয়।
রাজধানী নেপিডোতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে নতুন সেনাপ্রধানের নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়, যেখানে দুই জেনারেলকে সামরিক পদক পরিহিত অবস্থায় হাত মেলাতে দেখা যায়।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদেরকে দেশকে বিভক্তি ও অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। ২০১১ সালে তারা কিছুটা ক্ষমতা শিথিল করে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সুযোগ দেয়, যার ফলে অং সান সু চি বেসামরিক নেতৃত্বে উঠে আসেন।
২০২০ সালের নির্বাচনে সু চির দল বিপুল জয় পাওয়ার পর, বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় মিন অং হ্লাইং পুনরায় ক্ষমতা দখল করেন।
বর্তমানে সামরিকপন্থী ইউএসডিপি সংসদে শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং নতুন সরকারও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষক নাইং মিন খান্ত বলেন, মিন অং হ্লাইং এখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা চালিয়ে যাবেন, আর ইয় উইন ও তার ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হিসেবে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, এই প্রক্সি ব্যবস্থা মিন অং হ্লাইংকে আড়াল থেকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সাহায্য করবে।








