মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জরুরি বৈঠকে বসেছেন আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের সময় ইরান সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব হামলা ছিল ইসরায়েলের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে আঘাতের প্রতিশোধ হিসেবে। ওই সপ্তাহেই ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানি এবং গোয়েন্দা প্রধান ইসমাইল খাতিব।
রিয়াদের বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা ও আঞ্চলিক অবকাঠামোর ওপর ইরানের ক্রমবর্ধমান হামলার বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করা। এসব হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
কারা ছিলেন বৈঠকে
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, কাতার, আজারবাইজান, বাহরাইন, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, সিরিয়া, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এতে অংশ নেন।
এই দেশগুলো সরাসরি হামলা, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, জ্বালানি সরবরাহে সংকট কিংবা সম্ভাব্য গণঅভ্যুত্থান মতো নানা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
বিশেষ করে লেবানন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর হামলা শুরু করার পর ইসরায়েলি পাল্টা হামলায় তিন সপ্তাহের কম সময়ে অন্তত ৯৬৮ জন নিহত হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযানও চালাচ্ছে ইসরায়েল।
বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হলো
বৈঠকের প্রধান সিদ্ধান্তে ১২টি দেশ জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে আত্মরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করে।
তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে আবাসিক এলাকা, পানি লবণাক্ততা নিরসন কেন্দ্র, তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও কূটনৈতিক স্থাপনায় ইরানের হামলার নিন্দা জানায়।
একই সঙ্গে ইরানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, সব ধরনের হামলা বন্ধ করতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে, আরব দেশগুলোতে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা, অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালী বা বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে নৌ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে তবে তারা লেবাননে ইসরায়েলের হামলা ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণবাদী নীতিরও সমালোচনা করেছে।
যদিও বৈঠক থেকে একটি অভিন্ন অবস্থান এসেছে, তবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
এরপর কী হতে পারে
বৈঠক শেষে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ বলেন, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি এখনই কিছু বলবেন না।
তবে প্রয়োজনে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যবস্থা নেবে—এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, তাদের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরান দ্রুত পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করে প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধ করবে। তবে এ বিষয়ে তিনি সন্দেহও প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সময় লাগবে, কারণ পারস্পরিক বিশ্বাস ‘ভেঙে গেছে’।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের পর তিন বছর আগে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই নিহত হওয়ায় দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, যিনি তার নিহত পিতার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, এখনো জনসমক্ষে আসেননি।
বুধবার রাতে তার টেলিগ্রাম বার্তায় বলা হয়, প্রতিটি রক্তের বিনিময় আছে, এবং এই শহীদদের হত্যাকারীদের শিগগিরই মূল্য দিতে হবে।
ইরানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ১,৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট তেল স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪ সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে।
তারা দাবি করে, দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার জবাব দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তারা প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর অর্থনীতির ক্ষতি করতে চায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্ব ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরানের নীতি ও আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।








