সংস্কৃতিসাধক সন্জীদা খাতুনের ৯৪তম জন্মদিন শনিবার (৪ এপ্রিল)। ১৯৩৩ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বিশেষ এই দিনে তাঁর জীবন ও আদর্শকে স্মরণ করলো সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন মিলনায়তনে সন্জীদা খাতুনকে নিবেদন করে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে ছায়ানট। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা ‘আমার বনে বনে’ সমবেত নৃত্যগীতির মাধ্যমে। পরে বক্তব্য দেন সারওয়ার আলী।
অনুষ্ঠানে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের ‘দোলা লাগিল’ এবং ‘বসন্ত এলো এলো এলো রে’। একক সংগীত পরিবেশন করেন ইফফাত আরা দেওয়ান, যিনি রবীন্দ্রসংগীত ‘নয়ন মেলে দেখি, আমায়’ গেয়ে শোনান। এছাড়া ‘সুন্দর’ শিরোনামের নৃত্যগীতিও পরিবেশিত হয়।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, “সংগীতকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে একটি উদার ও সংঘাতমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সন্জীদা খাতুন সারাজীবন কাজ করে গেছেন।”
তিনি বলেন,“ঐতিহাসিকভাবে এই উপমহাদেশে—বিশেষ করে বাংলাদেশে—আত্মপরিচয়ের যে গভীর সংকট, তার ভিত্তি হচ্ছে ধর্মবিশ্বাস আর আমাদের জাতিপরিচয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এই বিভাজন কমবেশি সব দেশের মানুষের মধ্যে থাকলেও, আমাদের এই অঞ্চলে এটি একটি সাংঘর্ষিক ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কখনো একটি প্রাধান্য পায়, কখনো অপরটি। সন্জীদা খাতুন বছরের পর বছর ধরে প্রয়াসী হয়েছেন কী করে ধর্মবিশ্বাসকে অক্ষুণ্ণ রেখে জাতিপরিচয়ে ধন্য হয়ে এদেশে একটি উদার ও সংঘাতহীন সমাজ গড়া যায়। এক্ষেত্রে তাঁর অবলম্বন ছিল স্বাভাবিকভাবেই সংগীত। কারণ লালন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শাহ আব্দুল করিম—সকলে তো এমন সমাজেরই প্রেরণা দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষিত এবং একজন দক্ষ গবেষক হওয়া সত্ত্বেও সন্জীদা খাতুন নিজেকে শুধু ব্যক্তিগত চর্চায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাতের সময় তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন, যা বর্তমানে উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
আবহমান বাংলার সংগীতকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে প্রত্যয় তিনি রেখে গেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে পারলেই তাঁর জীবন ও কর্মের যথার্থ মূল্যায়ন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে সঙ্গত দেন সেতার, মন্দিরা, তবলা, কিবোর্ড, বাঁশি ও এসরাজের শিল্পীরা।
প্রসঙ্গত, ছোটবেলা থেকেই সন্জীদা খাতুন সংগীত ও সংস্কৃতি কর্মে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন। ১৯৬১ সালে স্বামী বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ও সাংবাদিক ওয়াহিদুল হকের সাথে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠনের মধ্যদিয়ে ষাট দশক থেকে সংগীত ও বাঙালি সংস্কৃতি জাগরণের আন্দোলনে কাজ করে গেছেন আমৃত্যু।
দেশ স্বাধীনের পর ছায়ানটের মাধ্যমে সারাদেশে সংগীত ও সংস্কৃতি কর্ম ছড়িয়ে দেন। রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ গঠন করেন। সংগীত, সংস্কৃতি, শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সন্জীদা খাতুনের বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত), দেশিকোত্তম পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)। এছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি, ২০১৯ সালে ‘নজরুল মানস’ প্রবন্ধ গ্রন্থের জন্য ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে। ২০২১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে।
সন্জীদা খাতুন গেল বছরের গত ২৫ মার্চ অনন্তলোকের পথে যাত্রা করেন।







