নানা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে শুক্রবার দেশের মাত্র একটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ভাটি বাংলার কৃষিজীবী মানুষের চিরকালীন জীবন সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে নির্মিত মুহাম্মদ কাইউম পরিচালিত সিনেমা ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’।
যদিও ৪ নভেম্বর সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে ছিলো অনিশ্চয়তা। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হলগুলোতে সিনেমাটি মুক্তির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন মুহাম্মদ কাইউম। তিনি চেয়েছিলেন, শুধু শহর নয়- একযোগে মফস্বল কিংবা গ্রাম বাংলার দর্শকের কাছেও সিনেমাটি পৌঁছে দিতে। কিন্তু চাইলেই কী সব হয়!

নির্মাতার ইচ্ছে আপাতত পূরণ হলো না বটে, তবে শেষ পর্যন্ত রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা শাখায় ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ সিনেমাটি মুক্তি পেলো, এটাই আপাতত স্বস্তি! দৈনিক সিনেমাটির মাত্র দুটি শো চলবে। সকাল ১১টায় একটি, এবং অন্যটি বিকেল সাড়ে ৪টায়।
শুক্রবার সকালে স্বভাবতই সিনেমা দেখার দর্শক থাকে হাতে গোণা! মুক্তির প্রথম দিন সকালে ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ দেখতে তারপরও বেশকিছু দর্শক এসেছেন। এদিন দুপুরে চ্যানেল আই অনলাইনকে মুহাম্মদ কাইউম বলেন, শুক্রবার ছুটির দিন। মানুষ একটু ব্যস্ত থাকেন। তাই হয়তো সকালের শো’তে কম লোক হয়েছে। তবে বিকেলের শো’তে আশা রাখছি দর্শক সমাগম বাড়বে।

এরআগে গত শনিবার সন্ধ্যায় ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ সিনেমাটির প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিনেমাটি দেখে প্রশংসা করতে দেখা গেছে দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু প্রিয় মুখকে। লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মানস চৌধুরী সিনেমাটিকে বলছেন, ‘নিবিড় খাটুনি ও নিষ্ঠার এক অনবদ্য দলিল’। কবি ব্রাত্য রাইসু সিনেমাটি দেখে বলছেন,‘গ্রেট ছবি। এই ছবি নতুন ক্লাসিক হিসাবে জায়গা দখল করবে। এর অসম্পূর্ণতা, ভুলত্রুটি সহই।’
নূরুল আলম আতিক থেকে শুরু করে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা, আবু শাহেদ ইমনরাও ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’র জন্য জানিয়েছেন শুভ কামনা। শুধু তাই নয়, সিনেমাটির ট্রেলার দেখে তরুণ নির্মাতা কিংবা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বহু মানুষ আগ্রহী হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজ থেকেই প্রচারণার অংশ হচ্ছেন। আহ্বান করছেন, যেনো এমন সিনেমা দর্শকপ্রিয়তা পায়।
সিনেমা সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক প্রচেষ্টাকে কীভাবে দেখছেন কাইউম? কিংবা প্রিমিয়ারের পর সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ানোকেই বা কীভাবে দেখছেন নির্মাতা?
এমন প্রশ্নে কাইউম বলেন, প্রশংসা তো যে কারোরই ভালো লাগে। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু আমার যে জায়গাটায় সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, সেটা হলো ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ সিনেমাটি যারাই দেখেছেন তারা কেউ উড়িয়ে দেননি। তারা বলেননি যে, সিনেমাটা হয়নি। লৌকিক উত্তরাধিকার ও লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আবহে আমি যাদের জীবন সংগ্রামের গল্প সিনেমাটিতে দেখিয়েছি, সেটা তারা সিনেমাটি দেখে আরও এপ্রিসিয়েট করেছেন। এটাই আমার ভালো লাগা।
নির্মাতা বলেন, গতানুগতিক ধারার বাইরের একটি ছবি ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’। এটি দেখে যারা প্রশংসা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কিন্তু তাই বলে শিল্প সংস্কৃতি সাহিত্য কিংবা সিনেমা অঙ্গনের মানুষের প্রশংসায় যে আমি বিরাট কিছু হয়ে গেছি, এটা আমি মনে করি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের পোস্টের ফলে আরও বেশি মানুষের কাছে সিনেমাটির কথা পৌঁছে গেছে। সাধারণ মানুষ ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’র নাম শুনতে পেরেছেন, তারা সিনেমাটি নিয়ে আগ্রহী হয়েছেন। এটা যে কোনো নির্মাতার জন্য আশীর্বাদই বলবো। আমি শুধু চাই, সিনেমাটি দর্শক দেখুক।

সিনেমা নির্মাণ বিরাট যজ্ঞের ব্যাপার। কিন্তু সেই যজ্ঞও সহজ মনে হয়, যখন নির্মিত সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরিকল্পনা করেন নির্মাতা! সেন্সরে যাওয়া, তারআগে এফডিসির একাধিক সংগঠনের অনাপত্তি সংগ্রহ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ, পরবর্তীতে পরিবেশকদের সঙ্গে দর কষাকষি- অন্তত সিনেমা মুক্তি নিয়ে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রায় সব স্বাধীন নির্মাতারই! ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ নিয়ে ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা হয়নি মুহাম্মদ কাইউমের।
তিক্ত অভিজ্ঞতার সূত্র ধরেই কাইউম বললেন,‘আমিও একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছি। স্বাধীন ধারার সিনেমা নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার পরিকল্পনা সুখকর নয়। কিন্তু সিনেমাটি তো আসলে বানানোই হয়েছে বড় পর্দার জন্য। সেই অভিজ্ঞতা দর্শককে দিতেই না একজন নির্মাতার এতো লড়াই! অথচ হল মালিকরা সিনেমা বলতেই বুঝেন ফর্মুলা সিনেমা। তারা মনে করেন, সিনেমা মানেই গানবাজনা, অ্যাকশন! ছকের বাইরে তারা ভাবতে চান না। বাণিজ্যিক উপাদান না থাকলে হল মালিকরা আগ্রহী হন না। তারা মনে করেই বসে থাকেন, ছকের বাইরে কোনো সিনেমা হলেই সেটার টিকেট বিক্রি হয় না। আমার সিনেমার ক্ষেত্রেও হল মালিকদের পূর্ব ধারণারই প্রতিফলন ঘটেছে। সে কারণেই ঢাকার মধ্যেও হল পাইনি, ঢাকার বাইরেতো নাই ই। অনেক অনুরোধ করে সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা শাখায় দৈনিক দুটি শো পাওয়া গেলো।’
গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সিনেমা নির্মাণ করলে শত বাঁধার মুখোমুখি হওয়াকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেন মুহাম্মদ কাইউম। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া একজন নির্মাতা বা সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক। সবাইতো সিনেমার মধ্য দিয়ে শুধু বিনোদন বিলাতে আসবেন না, কেউ কেউ তো মানুষের চিন্তাকেও নাড়া দিতে সিনেমা নিয়ে আসবেন। সেই বিকল্প পথটিও তো থাকতে হবে। শিক্ষা সংস্কৃতিতে সার্বিক যে অবক্ষয়, এটা সবকিছুকে অতি বাণিজ্যিকীকরণেরই বহিপ্রকাশ। এমন অবক্ষয় চলতে থাকলে আগামি দিনে যারা স্বাধীনভাবে সিনেমা নির্মাতা করতে চান, সেইসঙ্গে তরুণ নির্মাতাদের জন্য হবে আরও হতাশার।

প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি পরবর্তীতে বিকল্প ব্যবস্থায়ও ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ সিনেমাটি দর্শকদের দেখাতে চান কাইউম। বললেন, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেইসাথে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ সহ অন্য শহরগুলোতেও দেখানোর ইচ্ছে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহায়তার পাশাপাশি শিল্পকলা বা এরকম প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেও সিনেমাটি দেখাতে আমরা প্রস্তুত আছি। তেমন পরিকল্পনা আমাদের আছে।
কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া
কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: মুহাম্মদ কাইউম অভিনয়ে: জয়িতা মহলানবিশ, উজ্জ্বল কবির হিমু, সুমি ইসলাম, সামিয়া আকতার বৃষ্টি, বাদল শহীদ, মাহমুদ আলম,আবুল কালাম আজাদ, গাজী মাহতাব হাসান প্রমুখ। চিত্রগ্রাহক: মাজহারুল রাজু পরিচালকের বিশেষ সহকারি: প্রয়াত গাজী মাহতাব হাসান








