গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের নির্মাতাদের সিনেমা নজর কেড়ে নিচ্ছে পুরো বিশ্বের। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তাদের মাঝে অন্যতম, আরও আছেন রুবাইয়াত হোসেন, আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদ, যুবরাজ শামীম, মোহাম্মাদ রাব্বি এবং আসিফ ইসলাম। সম্প্রতি অভিষেক সিনেমাতেই বাজিমাত করলেন আরেক তরুণ নির্মাতা মাকসুদ হোসেন।
টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ডিসকভারি প্রোগ্রামে বিভিন্ন দেশের নবাগত ও উদীয়মান পরিচালকদের প্রথম ও দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র জায়গা পেয়ে থাকে। এবারের আসরে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র সিনেমা ‘সাবা’সহ ২৪টি চলচ্চিত্র।
মেহজাবীন চৌধুরী অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘সাবা’ সিনেমার তিনটি শো হয় উৎসবে। এরমধ্যে দু’টিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন মেহজাবীন, নির্মাতা ও সহশিল্পী মোস্তফা মনোয়ার।
‘এশিয়ান মুভি পালস’ সাইটে সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক পানোস কোজাথানাসিস ‘সাবা’ সিনেমার রিভিউ লিখেছেন। তার লেখাটি তুলে ধরা হলো।

সিনেমার গল্প ২৫ বছর বয়সী সাবাকে ঘিরে। সাবা তার উচ্চাভিলাষী মা শিরিনের সঙ্গে থাকেন। ২০ বছর আগে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় কোমরের নিচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে তার। শিরিনের চিকিৎসার প্রয়োজন যত বাড়তে থাকে, হৃদয়ের জটিলতাও তত বাড়তে থাকে। সাবা বুঝতে পারে তার ৩ লক্ষ টাকা প্রয়োজন, অপারেশন করে মাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। ডেভেলপারের কাছে বাড়ি বিক্রি করে দেয়া সহজ সমাধান, কিন্তু চাচাকে রাজি করানোর প্রক্রিয়া সহজ নয়। বিষয়টি শিরিনের ক্ষেত্রেও কঠিন।
সাবা একটি অন্ধকার হুক্কা লাউঞ্জে চাকরি পায়। অঙ্কুর তার বসকে রাজি করায় এই চাকরির জন্য। অঙ্কুর ও সাবার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সাবা মরিয়া হয়ে তার মায়ের জন্য টাকা জমাতে থাকে।
সিনেমাটিতে সুখের মুহূর্ত খুব কম এবং সংক্ষিপ্ত। নাটকীয় আখ্যানের মাধ্যমে মাকসুদ হোসেন বাংলাদেশের জীবন সম্পর্কে বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন। অন্ধকারে আঁকা হয়েছে সেই ছবি, বাস্তবসম্মত রঙে।
গত এক দশকে দেশে কোটিপতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কিন্তু জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এই বিষয়টি নির্মাতা তুলে ধরেছেন। উঠে এসেছে দুর্নীতির চিত্র, যা সমাজের নিম্ন স্তরের মধ্যেও বিদ্যমান। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও অচল বলা চলে, সেই চিত্রও আছে সিনেমায়। পানি নিয়ে যেসব সমস্যাগুলো রয়েছে তাও এখানে দেখানো হয়েছে।

এমন একটি পরিবেশে, প্রধান চরিত্রের স্বপ্ন নিরর্থক বলে মনে হয়। সাবা তার মাকে আবার সুস্থ করে তুলতে চায় যাতে সে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারে। এর জন্য তার অর্থের প্রয়োজন। তবে তা সে নিজে থেকে খুঁজে পায় না, তার স্বপ্নকে ইউটোপিক করে তোলে। অঙ্কুর অর্থ সংগ্রহ করতে চায় এবং ইউরোপে চলে যেতে চায়। কিন্তু সে যেভাবে এগিয়ে যায় তা পুরোপুরি নৈতিক নয়। সে যে সব সমস্যায় হোঁচট খায় সেগুলোও দেশের পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এমনকি শিরিনও তার অসুস্থ শরীর থেকে মুক্ত হতে চায়, যদিও তার মানে মৃত্যু।
স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার সংঘাত ফুটে উঠেছে সিনেমায়। সেই সাথে দেখানো হয়েছে মাকে বাঁচানোর প্রতি সাবার মরিয়া হয়ে ওঠা, যেটিকে নির্মাতা একটি আসক্তি হিসাবে চিত্রিত করেছেন। শেষ পর্যন্ত সে তার লক্ষ্য অর্জন করতে গেলে তার আশেপাশের মানুষদের সাথে কী ঘটবে সেটা সে মোটেই চিন্তা করে না।
নির্মাতার দৃঢ় পরিচালনার কারণে সিনেমায় আরোপিত আবেগপ্রবণতা এবং তীব্র মেলোড্রামাটিক মুহূর্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। স্ক্রিপ্টে ‘সুখী’ মুহূর্তের অভাব থাকলেও নির্মাণ দক্ষতার কারণে তা সীমা অতিক্রম করেনি।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় আর্টহাউস পদ্ধতির প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে বরকত হোসেন পলাশের সিনেমাটোগ্রাফিতে। সিনেমায় ইনটেন্স ক্লোজ আপের মাধ্যমে মূল চরিত্রের ওপর কনস্ট্যান্ট ফোকাস ‘ফরাসি’ স্বাদ দেয়। সাবা চরিত্রে মেহজাবীন চৌধুরী দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়েছেন। বাস্তবতা এবং পরিমাপের নিরিখে তিনি নিজের চরিত্রটি নান্দনিক ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অঙ্কুর চরিত্রে মোস্তফা মনোয়ারও দারুণ ছিলেন, যার মাঝে ভালো এবং মন্দ দুটি দিকই আছে। রোকেয়া প্রাচী খিটখিটে কিন্তু বেশ মোহমুক্ত শিরিনের চরিত্রে নজরকাড়া অভিনয় করেছেন। সামির আহমেদের সম্পাদনাও দারুণ। সাধারণত এই ধারার সিনেমাগুলো খুবই ধীর গতির হয়। কিন্তু ‘সাবা’ এক্ষেত্রে মধ্যম গতিতেই ছিলো পুরো ৯৫ মিনিট!
সূত্র: এশিয়ান মুভি পালস








