দেশে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতিকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত দুই বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং ইতোমধ্যে দেশের ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার ২ এপ্রিল সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয় লিখিতভাবে এ তথ্য জানায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে যোগাযোগের পর তারা সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে। এতে বলা হয়, আক্রান্তদের মধ্যে ৬৯ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু, আর ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বয়সগোষ্ঠীর উচ্চ সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
সংস্থাটি জানায়, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১৯০ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়েছে ৫৬টি জেলায়, তবে রাঙামাটি, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও বান্দারবানে এখনো হাম শনাক্ত হয়নি।
বর্তমানে প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় সংক্রমণের হার প্রায় ১৬ দশমিক ৮ যা দেশব্যাপী বিস্তারের স্পষ্ট লক্ষণ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। যদিও ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই হার নিয়ন্ত্রণে ছিল (প্রতি ১০ লাখে ১-এর নিচে), সম্প্রতি তা হঠাৎ বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদানে বিঘ্ন, অসম টিকাদান হার এবং নির্ধারিত ডোজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় শিশুদের একটি বড় অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর ফলে একটি সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
এদিকে, ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম ও রুবেলা নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি সেই অগ্রগতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আগে ধারাবাহিকভাবে সংক্রমণ কমলেও এখন তা নতুন করে বাড়ছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকা ইতোমধ্যে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন, নজরদারি জোরদার, দ্রুত শনাক্তকরণ, উন্নত চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকরভাবে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে এবং নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জনবল ঘাটতি পূরণ ও কমিউনিটির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তারা মনে করছেন।








