ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার দাবি করেছে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই-তাইবার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি কথিত মডিউল ভেঙে দেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। এ ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সমন্বিত অভিযানে মোট ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৭ জন ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ বলে দাবি পুলিশের।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, দিল্লি, কলকাতা ও তামিলনাড়ুর তিরুপ্পুরে একযোগে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে ভুয়া ভারতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করছিলেন।
তদন্তের সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন দিল্লির জনপথ মেট্রো স্টেশনে পাকিস্তানপন্থী স্লোগান, কাশ্মীরসংক্রান্ত উসকানিমূলক বার্তা এবং নিহত জঙ্গী বুরহান ওয়ানির ছবি সম্বলিত পোস্টার দেখা যায়। উর্দু ভাষায় লেখা পোস্টারগুলোতে ‘আমরা পাকিস্তানি, পাকিস্তান আমাদের’ এবং ‘কাশ্মীরি সংহতি দিবস’ সম্পর্কিত বার্তাও ছিল। পরে দিল্লির আরও কয়েকটি এলাকায় একই ধরনের পোস্টার উদ্ধার হয়।
মামলাটি পরে স্পেশাল সেলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ, নজরদারি তথ্য, মানব গোয়েন্দা তথ্য এবং ডিজিটাল বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় অভিযান চালিয়ে উমর ফারুক ও রোবিউল ইসলাম নামে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি তিরুপ্পুরে একযোগে অভিযানে আরও ছয়জনকে আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ দাবি করেছে, উমর ফারুক গত বছর মার্চে শাব্বির আহমেদ লোনের সঙ্গে যোগাযোগে আসে। পরবর্তীতে তাকে ভারতে লস্কর-ই-তাইবার কার্যক্রম বিস্তারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মডিউলটি শুধু প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রেকি করা, ভিডিও ধারণ এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের পরিকল্পনাও চলছিল। স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবহার করে অস্ত্র সংগ্রহের প্রস্তুতির কথাও উল্লেখ করেছে পুলিশ।
ফেব্রুয়ারির ৬ ও ৭ তারিখে উমর ফারুক ও তার সহযোগীরা দিল্লির অন্তত ১০টি স্থানে পোস্টার লাগিয়ে সেগুলোর ভিডিও ধারণ করে হ্যান্ডলারের কাছে পাঠায় বলে অভিযোগ। শাব্বির আহমেদ লোন এসব কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন বলে তদন্তকারীরা দাবি করেছেন।
তল্লাশিতে ১০টি মোবাইল ফোন, ২৫টি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, ৫টি পয়েন্ট অব সেল মেশিন, বাংলাদেশি পাসপোর্ট এবং বেশ কিছু পোস্টার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সবশেষ ২৯ মার্চ দিল্লির গাজীপুর নর্দমা এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাব্বির আহমেদ লোনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নেপাল সীমান্ত হয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন এবং বাংলাদেশে আত্মগোপনে থেকে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, শাব্বির পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইবার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন। আবু হুজাইফা, সুমামা বাবর ও আব্দুল রহমানের নাম উল্লেখ করেছে পুলিশ। এছাড়া তেহরিক-উল-মুজাহিদিন এবং ইউএপিএ-ঘোষিত সন্ত্রাসী আসিফ দারের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, শাব্বির আহমেদ লোন ২০০৭ সালেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং তখন তার কাছ থেকে একে-৪৭ ও গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। ২০১৮ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ।
দিল্লির একটি আদালত সোমবার তাকে পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ডে পাঠিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে তাকে “প্রশিক্ষিত ও বিপজ্জনক” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।
তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন। তবে বিষয়টি ব্যক্তি পর্যায়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র বা সামগ্রিক নাগরিকসমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখার কোনো ভিত্তি নেই বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
ঘটনার তদন্ত চলছে এবং আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।








