একটি ডাইনিং টেবিলকে কেন্দ্র করে পরিবারের চার সদস্য বসে আছেন। খাবার সাজানো থাকলেও কারও মনোযোগ সেদিকে নেই। প্রত্যেকের হাতে সচল স্মার্টফোন। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবনযাত্রার ছবি দেখছেন কেউ ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটে ব্যস্ত আবার কেউ দূরবর্তী পরিচিতের সাথে বার্তা বিনিময় করছেন।
পাশে বসে থাকা নিকটজনের সাথে দীর্ঘ সময় কোনো বাক্য বিনিময় হচ্ছে না। এই নিস্তব্ধতা এবং ডিজিটাল কোলাহলের সংমিশ্রণ আধুনিক জীবনযাত্রার একটি নিয়মিত চিত্র। মানুষ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত যুগে বাস করলেও একাকীত্বের বোধ অনেক ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠছে। যোগাযোগের প্রযুক্তিগত মাধ্যম বিস্তৃত হলেও মানুষের পারস্পরিক মানসিক দূরত্ব বাড়ছে। এটি আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে প্রযুক্তিগত সংযোগ থাকলেও মানবিক সংবেদনশীলতা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি-এর সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১৩ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। যোগাযোগের এই অবারিত সুযোগ দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করলেও সম্পর্কের গভীরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অতীতে যোগাযোগের সীমিত উপায়ের মাঝে যে মানসিক নিবিড়তা ও প্রতীক্ষা ছিল তা বর্তমানের তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদানের যুগে অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এখন যোগাযোগ অনেক সহজলভ্য হলেও সেই সংযোগের মাঝে আবেগীয় গভীরতা সামান্য। মানুষ এখন যান্ত্রিকভাবে সংযুক্ত হলেও আত্মিকভাবে আবদ্ধ হতে পারছে না। এটি ডিজিটাল যুগের এমন একটি পরিস্থিতি যা মানুষকে ক্রমশ যান্ত্রিক করে তুলছে। মানুষ এখন কথা বলছে বেশি কিন্তু শোনার বা অনুধাবন করার ধৈর্য কমে আসছে। দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থার মাঝে সম্পর্কের চিরাচরিত মায়া অনেক ক্ষেত্রে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামনে একটি কৃত্রিম জগত উপস্থাপন করেছে। এখানে ব্যক্তি সাধারণত তার জীবনের কেবল উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় দিকগুলো প্রদর্শন করে। অন্যের সেই পরিকল্পিত সুখ দেখে নিজের সাধারণ জীবনকে অসম্পূর্ণ মনে করা এখন একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ মানুষের মধ্যে বিরক্তি ও হীনম্মন্যতা তৈরি করছে যা নিকটজনের সাথে স্বাভাবিক আচরণে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল জগতে বিপুল সংখ্যক অনুসারী থাকলেও প্রকৃত সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের সংখ্যা নগণ্য। মানুষ এখন প্রত্যক্ষ সাহচর্যের চেয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানানোকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করছে। এই প্রদর্শনীবাদী সংস্কৃতি মানুষকে প্রকৃত সামাজিকতা থেকে দূরে সরিয়ে একটি নিঃসঙ্গ ভার্চুয়াল জগতে বন্দি করে দিচ্ছে। পর্দার আলোয় উজ্জ্বল হওয়ার প্রচেষ্টায় মানুষ অনেক সময় পাশের মানুষটির মনের ভাষা পড়তে ব্যর্থ হচ্ছে।
ডিজিটাল আসক্তি মানুষের মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে একজন গড়পড়তা ব্যবহারকারী দিনে অসংখ্যবার ফোনের স্ক্রিনে তাকান। এই অবিরত ডিজিটাল ব্যস্ততা অন্যের কথা ধৈর্য ধরে শোনার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। নিকটজন যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে আসেন তখন মনোযোগের বড় অংশ থাকে ফোনের নোটিফিকেশনে। এই ডিজিটাল অবহেলা ধীরে ধীরে সম্পর্কের মাঝে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করছে। এর ফলে পারিবারিক কাঠামোর মৌলিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই ছাদের নিচে সহাবস্থান থাকলেও পারস্পরিক সংযোগের তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানুষ এখন ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে সক্রিয় থাকলেও ব্যক্তিগত সান্নিধ্যে ম্লান হয়ে পড়ছে। এটি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহমর্মিতার অভাব। স্ক্রিনের ওপাশে থাকা মানুষকে অনেক সময় কেবল একটি প্রোফাইল হিসেবে দেখা হয়, রক্ত-মাংসের আবেগপ্রবণ মানুষ হিসেবে নয়। এর ফলে সামাজিক মাধ্যমে কাউকে সমালোচনা করা বা সম্পর্কের ইতি টানা সহজ হয়ে গেছে। সাইবার বুলিং থেকে শুরু করে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা সবকিছুর পেছনে এই ডিজিটাল দূরত্বের ভূমিকা রয়েছে। ইন্টারনেটের প্রসারে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংকুচিত হলেও মনের কথা নিঃসংকোচে ভাগ করে নেওয়ার মতো বিশ্বস্ত মানুষের অভাব দেখা দিচ্ছে। বন্ধুত্বের সংজ্ঞা এখন অনেক ক্ষেত্রে লাইক ও কমেন্টের পরিসংখ্যানে বন্দি হয়ে পড়েছে। এই যান্ত্রিকতা মানবিক মূল্যবোধকে সংকটাপন্ন করছে। যখন মানুষকে কেবল একটি ইন্টারফেস হিসেবে দেখা হয় তখন তার আবেগ অন্যদের হৃদয়ে আগের মতো আলোড়ন তৈরি করে না। এই পরিস্থিতি সমাজকে একটি যান্ত্রিক রূপ দিচ্ছে।
যান্ত্রিকতার এই প্রভাব মানুষকেও প্রভাবিত করছে। বর্তমানে উৎসব পালন বা ভ্রমণ করার চেয়ে সামাজিক মাধ্যমে সেই উপস্থিতির প্রমাণ রাখা অনেকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মুহূর্তগুলো প্রকৃত অর্থে উপভোগ করার চেয়ে সেগুলো ক্যামেরাবন্দি করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই প্রদর্শনীবাদী জীবন মানসিক প্রশান্তি ব্যাহত করছে। মানুষ সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকার অভিনয় করলেও অনেক সময় একাকীত্বের শিকার হচ্ছে। ডিজিটাল যোগাযোগ তথ্য আদান-প্রদান করতে পারলেও হৃদয়ের উষ্ণতা বা প্রত্যক্ষ অনুভূতির বিকল্প হতে পারে না। জনসমাগমে থেকেও ফোনে মগ্ন থাকা সামাজিক আচরণের একটি নেতিবাচক বিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মানুষ এখন মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার চেয়ে সেই মুহূর্তের প্রামাণ্য চিত্র তৈরিতে বেশি ব্যস্ত যা জীবনকে প্রকৃত আনন্দ থেকে বিচ্যুত করছে।
ডিজিটাল যুগের এই প্রভাবে শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা এখন খেলার মাঠের চেয়ে ডিজিটাল পর্দার রঙিন জগতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। এর ফলে তাদের সামাজিক দক্ষতা যথাযথভাবে গড়ে উঠছে না। বড়দের দেখে ছোটরাও একই অভ্যাসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অভিভাবকরা যখন নিজেরা ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তখন তারা সন্তানকেও শান্ত রাখার জন্য ডিজিটাল ডিভাইস হাতে তুলে দিচ্ছেন। এটি একটি নীরব প্রজন্মগত পরিবর্তন যা ভবিষ্যতের সম্পর্কগুলোর ভিত নড়বড়ে করে দিতে পারে। সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য ও সহনশীলতা ডিজিটাল যুগের তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন সম্পর্ক রক্ষা করার চেয়ে দ্রুত বিকল্প খুঁজতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ।
ভার্চুয়াল জগতের অভিবাদন কখনোই প্রিয়জনের একটি সহমর্মী চাহনির বিকল্প হতে পারে না। মানুষ যদি ডিজিটাল সংযোগের মোহে পড়ে প্রকৃত মানবিক সম্পর্কগুলো বিসর্জন দেয় তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। সভ্যতার অগ্রযাত্রা তখনই সার্থক হয় যখন তা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করে। প্রযুক্তি একটি মাধ্যম মাত্র এটি লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হলো ভালোবাসা এবং সাহচর্য যা কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যালগরিদম দিতে পারে না। সম্পর্কের এই যান্ত্রিকতা মানুষকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পরিশেষে ডিজিটাল যুগ মানুষের হাতের মুঠোয় বিশ্বকে এনে দিলেও কাছের মানুষকে দৃষ্টির আড়ালে ঠেলে দিচ্ছে। এই ব্যবধান ঘুচাতে সচেতনতা ও পারিবারিক চর্চা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার হওয়া উচিত জীবনের গুণগত মান বাড়ানোর জন্য সম্পর্কের গভীরতা কমানোর জন্য নয়। পর্দার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে মানুষ যেন তার ভেতরের মানবিক সত্তা আর প্রিয়জনদের হারিয়ে না ফেলে। জীবন কেবল পিক্সেলের সমষ্টি নয় বরং মানুষের সাথে কাটানো জীবন্ত কিছু মুহূর্ত ও স্মৃতির নাম। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সেই সময়ে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন যখন মানুষ মানুষকে সময় দিত এবং প্রতিটি সম্পর্ক আন্তরিকতায় পূর্ণ ছিল। ডিজিটাল কোলাহলের মাঝে মানবিক মায়ার সন্ধান করাই হোক আগামীর লক্ষ্য। আধুনিকতা যেন মানুষকে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না করে বরং আরও বেশি মানবিক হতে সাহায্য করে সেই নিশ্চয়তা আজ সবাইকে নিতে হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)


