যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধের ১৫ দিনে গড়ালো। কার্যত মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি কবে কখন তা নিয়ে যে ঘোর অনিশ্চয়তা আর তা যে সহসাই কাটছে না সেটা বলাই যায়। এরই মধ্যে কার্যত বন্ধ বিশ্বের জ্বালানি তেল পরিবহনের অন্যতম রুট ‘হরমুজ প্রণালী’।
বিশ্বের সেন্ট্রাল পয়েন্টে ঘিরে যুদ্ধের-বারুদের উত্তাপ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। জ্বালানি সংগ্রহে দিনে-রাতে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জনদুর্ভোগে কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তেলের ডিপোতে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুত ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার গত ৮ মার্চ ১১ দফা নির্দেশনাও দিয়েছে সরকার। আসুন বৈশ্বিক যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের উত্তাপে কতটা পুড়ছেন এদেশের সাধারণ জনমানুষ। আর পরিস্থিতি উত্তরণে মানে এদেশের রুটি রিজিক আর অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মূল চালিকা শক্তি জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া না হওয়া কিংবা কিভাবে সংকট মোকাবেলায় কি করা উচিত আসুন খানিক দৃষ্টিপাত করি বিষয়ের গভীরে।
আসুন সমস্যার শুরুটা কোথায় তা জানি! কার্যত বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালী। জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে বিশ্বের তেল সমৃদ্ধ ও প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েতের মতো সেন্ট্রাল পয়েন্টের দেশগুলো জ্বালানি পরিবহন করে থাকে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে এই উল্লেখিত দেশগুলোর সাথে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার তথা উন্নত বিশ্বের সাথে একমাত্র সামুদ্রিক সংযোগ এই হরমুজ প্রণালী। এই পথে প্রতিদিন বিশ্বের ২০ শতাংশ বা প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং প্রচুর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ব বাজারে প্রবেশ করে।
তাই বলাই যায় যে, আফ্রিকার আমাজন যদি হয় বিশ্বের ফুসফুস তবে হরমুজ প্রণালীকে বলা চলে বিশ্ব বাণিজ্যের মেরুদণ্ড। সুতরাং ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ থাকায় জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ কার্যত বন্ধ। যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবেই দেখা দিয়েছে। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বের দেশে দেশে অর্থনীতি, জীবন জীবিকার চাকাও অনেকটাই নিশ্চল হওয়ার পথে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির বাইরে না।
বৈশ্বিক যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের মুখে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অবশ্য পালনীয় ১১ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম অফিস ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এসি ২৫° এর উপরে রাখা, আলোকসজ্জা বন্ধ, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং সরকারি যানবাহনের জ্বালানি বরাদ্দ কমানো অন্যতম। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, কপোরেশনসহ সব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই নির্দেশনা কার্যকর হবে।
এছাড়াও জ্বালানি তেল সাশ্রয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রতিদিন ১০ লিটার ও মোটরসাইকেলে ২ লিটার তেল নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করেছে ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কপোরেশন-বিপিসি’। তবে মানুষের চাহিদার সাথে যোগানের পার্থক্য থাকায় দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কারণে মানুষের ভোগান্তির সাথে খানিক উদ্বেগ ছাড়াও দুর্ভোগজনিত কারণে ক্ষোভও আছে।
এক্ষেত্রে আসুন জানি দেশে প্রতিদিন জ্বালানি তেলের চাহিদা কত। পরিসংখ্যান বলছে, আগের হিসেবে এদেশে প্রতিদিন জ্বালানি তেল বিক্রি হতো ১৩ হাজার মেট্রিকটন। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলার মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হামলা পাল্টা হামলায় যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধের ঘোষণার পর পরই বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট হতে পারে এমন আশঙ্কায় প্রতিদিন ১৩ হাজার মেট্রিকটন বিক্রি রাতারাতি বেড়ে দাঁড়ায় ২০ থেকে ২২ হাজার মেট্রিক টনে।
বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘প্যানিক বায়িং’ বা ‘আতঙ্কের কেনাকাটা’। তবে এই প্যানিক বায়িংয়ের মাধ্যমে একশ্রেণীর দুবৃত্তদের মজুতদারি বা কালোবাজারীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমাকে এই আশঙ্কার উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন সেই কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ‘ক্যাব’র জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলছেন, কালোবাজারি ও মজুতদারি ঠেকানো এবং জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় এখনই ‘কার্যকর রেশনিং ব্যবস্থা’ চালু করা দরকার।
খোলা বাজারে জ্বালানি তেল এভাবে বিক্রি-বিতরণের দায়িত্ব শুধুমাত্র পেট্রোল পাম্প মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। এতে করে জ্বালানি তেলে বাজারের স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ছে বলেও মনে করেন ‘ক্যাব’র এই উপদেষ্টা। বৈশ্বিক সমস্যার সুযোগে দেশের অভ্যন্তরের কালোবাজারির হাতে জ্বালানি তেলের বাজার চলে যাওয়ার আশঙ্কা দূর করতে ড. শামসুল আলম জোর পর্যবেক্ষণ এবং ভোক্তাদের ভোগান্তি কমাতে ‘রেশন কার্ডের’ মাধ্যমে সমতার ভিত্তিতে জ্বালানি বিক্রির জোর পরামর্শ দিয়েছেন। তবে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় চলাচল বা যোগাযোগ ব্যবস্থা গতিশীল রাখতে ‘গণপরিবহনে’ জ্বালানি নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকারের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বলছেন, সরকার ছুটির দিনেও ডিপোগুলো খোলা রেখেছে। তবে তারা পাম্প মালিকেরা তো চাহিদামত জ্বালানি পাচ্ছেই না। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, গ্রাহক ভোক্তারা জানছে ছুটির দিনেও ডিপো খোলা আর আমরা পাম্প মালিকেরা ভোক্তাদের চাহিদার অর্ধেকও সরবরাহ করতে পারছি না। ফলে ভোক্তারা পাম্পে গিয়ে চাপ তৈরি করছে। ঘটছে নানান অনাকাঙ্কিত ঘটনাও। এক্ষেত্রে ভোক্তা-জনগনকেও পরিস্থিতির প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি না করলে পরিস্থিতির উত্তরণ কঠিন হবে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্ব পালনকারী জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশ অবশ্যই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সরকার নানান দিক থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ ভবিষ্যতে কি পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে তার ভিত্তিতে জ্বালানীর ব্যবহারে ‘শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা’ দরকার।
এর আওতায় জরুরি সেবা যেমন:
গণপরিবহন, হাসপাতাল, অপারেশন থিয়েটার, আগুন নিয়ন্ত্রণ এর মতো জরুরি সেবা খাতগুলোকে অগ্রাধিকারে রেখে এখন থেকেই ‘জ্বালানীর সীমিত ব্যবহারের’ জোর পরামর্শ দিয়েছেন। মূলত এখন থেকেই জ্বালানীর সীমিত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে জটিল ও আরো কঠিন পরিস্থিতি এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ে নানান উদ্যোগ-কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, হোম অফিস ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশের মত রৌদ্রময় বিপুল সূর্যরশ্মির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সন্ধ্যার পর মার্কেট, খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন শোরুম বন্ধ রাখার তাগিদ দিয়েছেন।
দিনের আলোর বিশাল প্রাপ্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে সূর্যের আলো কাজে লাগানোর পুরানো পরামর্শ নতুন করে সামনে এনেছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ম তামিম মনে করেন, সবমিলিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তির উপর নির্ভর করছে জ্বালানি সংকট কতদিন বা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না। সবমিলিয়ে জ্বালানি সংকট আরো গভীর ও সংকটময় হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই যায়। এক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে অত্যাবশ্যকীয় কিংবা না হলেই নয় এমন চাহিদার আলোকে ‘শক্তিশালী চাহিদা ব্যবস্থাপনা’ করার মাধ্যমে সীমিত ও সাশ্রয়ীভাবে জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।








