বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন নিয়ে সম্প্রতি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ও গুজবের বিস্তার ঘটেছে, যা জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। কিছুদিন আগে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ভিত্তিহীন দাবি তোলা হয়েছিল যে, এই দ্বীপটি তাদের ভূখণ্ডের অংশ। বাংলাদেশের কড়া প্রতিবাদ ও রাখাইন রাজ্যে সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সেই দাবি ভেস্তে গেছে।
এবার শুরু হয়েছে নতুন গুজব। ভারতীয় মিডিয়া জোরশোরে এটা বলার চেষ্টা করছে যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নৌঘাঁটি তৈরির জন্য ইজারা দিতে যাচ্ছে। এসব প্রচারণার জবাবে এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সেন্ট মার্টিনের নাম পরিবর্তন করে এর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নাম ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ ফিরিয়ে আনা হতে পারে একটি শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া।
সেন্ট মার্টিন, যা স্থানীয়ভাবে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামে পরিচিত ছিল, বঙ্গোপসাগরের উত্তরে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আরব বণিকেরা প্রথম এই দ্বীপটিকে ‘জিঞ্জিরা’ নামে উল্লেখ করেন এবং পরে এটি ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৯০-এর দশকে এখানে বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের কিছু মৎস্যজীবী পরিবার বসতি স্থাপন করে।
দ্বীপটির আসল নাম পরিবর্তন করে ১৯০০ সালে ব্রিটিশরা এটিকে সেন্ট মার্টিন নামকরণ করে, যা তৎকালীন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নামে উৎসর্গ করা হয়। কিন্তু এই নামকরণের পেছনে কোনো ঐতিহাসিক কিংবা ধর্মীয় ভিত্তি ছিল না; দ্বীপে কোনো খ্রিস্টান জনবসতি ছিল না, এবং সেন্ট মার্টিন নামে কোনো খ্রিস্টান সাধু এখানে এসেছিলেন- এমন কোনো দলিলিক প্রমাণও নেই। এই নামকরণ আসলে ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ছিল, যেখানে স্থানীয় ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে বিদেশি প্রভাব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এডওয়ার্ড সাইদ তার ওরিয়েন্টালিজম তত্ত্বে দেখিয়েছেন কিভাবে উপনিবেশিক শক্তিগুলো পূর্বের দেশগুলোকে নিজেদের মতো করে পরিচালনা এবং প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে সেগুলোর নাম পরিবর্তন, সংস্কৃতি উপেক্ষা, এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। সেন্ট মার্টিনের নামকরণ প্রক্রিয়া সেই প্রাচ্যবাদী মনোভাবের উদাহরণ, যেখানে স্থানীয় ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামটি বাদ দিয়ে বিদেশি নাম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সাইদের তত্ত্ব অনুযায়ী, ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামটি ফিরিয়ে আনলে এটি সেই উপনিবেশিক প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রতীকী উদ্যোগ হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন সম্ভব হবে।

পোস্টমডার্নিজম তত্ত্বের আলোকে দেখা যায় যে, প্রতিটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় থাকার অধিকার রয়েছে এবং কোনো জাতি বা গোষ্ঠী অন্য কারো সংস্কৃতির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। সেন্ট মার্টিন নামটি আধিপত্যমূলক মেটা-ন্যারেটিভের অংশ, যা ব্রিটিশরা তাদের সংস্কৃতির ছাপ চাপিয়ে দিয়েছে। ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলে স্থানীয় জনগণের নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শিত হবে এবং একইসঙ্গে একটি জাতির সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয়, বরং দেশের গর্ব এবং স্বাধীনতাকে নতুনভাবে তুলে ধরবে।
ভারতের কিছু মিডিয়া এবং মিয়ানমার কর্তৃক সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে ছড়ানো প্রোপাগান্ডা এবং ভিত্তিহীন দাবির জবাবে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামটি পুনঃপ্রবর্তন হবে যথাযথ সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া। এটি আন্তর্জাতিক মহলে একটি সাফ বার্তা পাঠাবে যে, সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা সচেতন ও প্রস্তুত। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হবে, বাংলাদেশের জনগণ বিদেশি প্রভাব ও প্রোপাগান্ডার কাছে মাথা নত করে না এবং তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় অটল।
সেন্ট মার্টিনের নাম পরিবর্তনের ফলে কিছু আন্তর্জাতিক জটিলতা দেখা দিতে পারে, বিশেষত মানচিত্র এবং নেভিগেশন ব্যবস্থায়। তবে এসব সমস্যা সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, ‘সেন্ট মার্টিন (নারিকেল জিঞ্জিরা)’ নামে একটি হাইব্রিড নাম ব্যবহার করা যেতে পারে, যা প্রাথমিকভাবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি বজায় রাখবে এবং ধীরে ধীরে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামটি প্রতিষ্ঠিত হবে।
দ্বিতীয়ত, IMO (International Maritime Organization) এবং IHO (International Hydrographic Organization) এর সঙ্গে যোগাযোগ করে নামটি নিবন্ধন ও হালনাগাদ করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, পর্যটন সেবা ও গাইডবুকে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ অন্তর্ভুক্ত করে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে পরিচিতি বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়াও, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণার মাধ্যমে নতুন নামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা যেতে পারে।

বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ ও অঞ্চল উপনিবেশিক বা ঐতিহাসিক প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য তাদের স্থানীয় নাম পুনরুদ্ধার করেছে। ভারতের বোম্বে শহর ১৯৯৫ সালে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানাতে মুম্বাই নাম নেয়; একইভাবে বার্মা দেশের নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রাখা হয়, যা দেশটির বহুজাতিক জাতির পরিচয়কে তুলে ধরে। শ্রীলঙ্কা ব্রিটিশ উপনিবেশিক নাম ‘সেলন’ পরিবর্তন করে ঐতিহ্যবাহী ‘শ্রীলঙ্কা’ নামটি গ্রহণ করে। আফ্রিকার রোডেশিয়া স্বাধীনতার পর স্থানীয় শোনা ভাষার প্রতীকী নাম ‘জিম্বাবুয়ে’ গ্রহণ করে, এবং গোল্ড কোস্ট স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রাচীন সাম্রাজ্যের নাম ‘ঘানা’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ইন্দোনেশিয়ার ব্যাটাভিয়া ডাচ উপনিবেশিক নাম ছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘জাকার্তা’ নাম ধারণ করে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
এসব নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব দেশ তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধার করেছে এবং উপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পুরোনো নাম ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ ফিরিয়ে আনাও একইভাবে দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং উপনিবেশিক স্মৃতি মুছে ফেলার শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে কাজ করবে।
সেন্ট মার্টিনকে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা দেশি-বিদেশি প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের একটি যথাযথ সাংস্কৃতিক জবাব হবে। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার শক্তিশালী প্রতীক এবং উপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবেও কাজ করবে। এ উদ্যোগে সেন্ট মার্টিনের প্রতি বাংলাদেশের অটল অধিকার এবং জনগণের আস্থা পুনরায় অর্জন হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








