মোহাম্মদ আক্তার আলম: বাড়িটিতে ধসে পড়া ইটের ভগ্নস্তুপ, রাজকীয় প্রবেশদ্বার, বিশাল বিশাল থাম, সিঁড়ি ঘর, সিংহ দরজা, কাচারি ঘর, অন্দরমহল, রংমহল, হেঁশেল ও শাঁনবাধানো পুকুর ঘাটের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কোন একসময় এই বাড়িতে রুচিশীল মানুষ বাস করতেন।
বর্তমানে পুরনো ইটের দেয়ালে অসংখ্য পরগাছা ও ভেতরে ময়লার স্তুপ থাকলেও বাড়িটি দখলবাজ মুক্ত হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক টিপু সুলতান, অঞ্জন চন্দ্র পালের আন্তরিকতায় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় ২০২১ সালে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের প্রত্বতত্ত্ব অধিদপ্তর সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে বাড়িটি প্রাথমিক দখলমূক্ত করে। তবে দখল মূক্ত হলেও বাড়ীটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে লক্ষ্মীপুরবাসী। কেননা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারে ৪০০ বছর পূর্বে নির্মিত হওয়া জমিদার বাড়িটির সাথে জড়িয়ে আছে দেশভাগের ইতিহাস।

এই এলাকায় জমিদারির সূচনার সময় ৪০০ বছর পূর্বে ভারতের কলকাতায় আদি নিবাস থাকা জমিদার লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণব বাড়িটি নির্মাণ করেন। লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণবের বংশধরেরা ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলের বানিজ্যিক এজেন্ট ছিল। তাই স্থানীয় লোকেরা তাদের বৃটিশদের দালাল মনে করে এই স্থানকে দালালবাজার ও বাড়ির নাম দালাল বাড়ি নামকরণ করেন।
বাড়িটি ইতিহাসের অংশ হওয়া সম্পর্কে জানা যায়, ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন। এর সপ্তাহ তিনেক আগে কলকাতায় ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক হানাহানি। যা, ‘দা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। উত্তপ্ত সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ায় নানা গুজবের ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্রই।

তৎকালীন নোয়াখালীর অন্তর্গত লক্ষ্মীপুরেও ছিল চাপা আতঙ্ক। লক্ষ্মীপূজার দিন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়িতে আক্রমণ শুরুর পর হিংসা, হানাহানি আর লুটপাট জেলায় ছড়িয়ে পড়ল বারুদের মতো। এই অবস্থায় অনেক হিন্দু পরিবার এক কাপড়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন কলকাতায়। অনেকের মতো লক্ষ্মীনারায়ণ জমিদার বাড়ির বাসিন্দারাও ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। ৭৮ বছর আগের সেই কালো অধ্যায় ধারণ করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ্মী নারায়ণ জমিদার বাড়ি। লক্ষ্মীনারায়ণের বংশধরেরা বাড়িটি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমলে এটি বহুবার নানা চক্র দখলের চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কেউ দখল করতে পারেনি। বহুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়িটি পুরোনো স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
৫ একর জায়গা নিয়ে ষোল শতাব্দিতে নির্মিত হওয়া বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত এই বাড়ি ঘুরে দেখতে অনেকেই আসেন। জমিদারবাড়ি দেখতে আসা ব্যবসায়ী নাছির আলম মিশন ও এ আর বিপ্লব বলেন, জমিদারবাড়ী দেখতে আসছি। বাড়িটির কারুকাজ অনেক সুন্দর। তবে ভিতরের পরিবেশ খুবই নোংরা। কর্তৃপক্ষ এটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলে পর্যটক আকৃষ্ট হবে ও শিক্ষার্থীসহ যুবসমাজ ঘুরতে আসবে। তারা জমিদারবাড়ির ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।

সাংবাদিক জাহাঙ্গীর হোসেন লিটন বলেন, বৃটিশ আমলের জমিদার বাড়িটি লক্ষ্মীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন, তাই এটাকে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সভাপতি সামছুল করিম খোকন বলেন, নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে দালালবাজার জমিদার বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণ দুটোই করতে হবে।
শিক্ষার্থী বীথি আক্তার ও ইতি আক্তার বলেন, জমিদারবাড়ীর প্রবেশমূখে বাড়ির বিভিন্ন স্থাপনার ইতিহাসও লিখে রাখলে শিক্ষার্থীরা ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হতে পারবে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.জামশেদ আলম রানা বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে দালালবাজার জমিদার বাড়ী সংস্কার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং সে মোতাবেক বাজেট নিরুপণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।








