‘রাজাধিরাজ রাজ্জাক’-এর মতো স্মরণীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পর এবার দেশের জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পীকে নিয়ে হাজির হচ্ছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। বাংলা গানের সম্রাজ্ঞী সাবিনা ইয়াসমিনকে নিয়ে নির্মিত তার নতুন ডকুফিল্মের নাম ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমিন’।
সম্প্রতি ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমিন’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রটির একটি প্রাইভেট প্রদর্শনী হয় চ্যানেল আইতে। শাইখ সিরাজ নির্মিত এই ডকুফিল্মে বাংলাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং শিল্পীজীবনের নানা দিক ফুটে উঠেছে। সাবিনা ইয়াসমিন যিনি ষাটের দশক থেকে শুরু করে আজও দেশের সংগীতাঙ্গনে সক্রিয়, তাঁর শিল্পজীবনের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও জীবনের নানা দিক এই প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে, যা একদিকে যেমন সময়ের সীমাবদ্ধতায় চ্যালেঞ্জ ছিল, তেমনি অন্যদিকে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণশৈলীর দৃষ্টিতে এটি হয়ে উঠেছে একটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ।
এর নির্মাণশৈলী সরল অথচ গভীর। সাবিনা ইয়াসমিনের ব্যক্তিগত জীবন, সংগীত ভ্রমণ ও সমাজ- সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করেছেন শাইখ সিরাজ। প্রামাণ্যচিত্রে সাবিনার শিল্পী পরিচয় ছাড়াও তার সংগ্রাম, সাফল্য ও বাংলাদেশি সিনেমার সংগীত সর্বৈব জনপ্রিয় করে তুলতে তার অবদানকেও গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ সাক্ষাৎকার, ঐতিহাসিক ছবি ভিডিও, গানের পরিবেশনা এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের মাধ্যমে প্রামাণ্যচিত্রটি একটি বর্ণাঢ্য এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
ডকুফিল্মে তিন ধাপে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাইখ সিরাজ- সাবিনা ইয়াসমিনের বাসায়, একটি দৃষ্টিনন্দন রিসোর্টে এবং চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে। সমান্তরাল সম্পাদনায় এই তিনটি লোকেশনেই ধরা পড়েছে সাবিনা ইয়াসমিনের শিল্পীজীবনের গল্প, হাসি, আবেগ আর অজানা অনেক অধ্যায়।
চ্যানেল আই স্টুডিওতে ছিলেন এই প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পীরা। কনা, লিজা, কোনাল, ইমরান, ঝিলিক, রাকিবা ঐশী ও আতিয়া আনিসা। এই ৭জন শিল্পী পরিবেশন করেছেন সাবিনা ইয়াসমিনের সাড়ে ১৫ হাজার গানের ভাণ্ডার থেকে বাছাই করা ১২টি প্রিয় গান! প্রতিটি গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মজার ও আবেগঘন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন সাবিনা ইয়াসমিন নিজেই। শুধু গানের গল্প নয়, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে এই কিংবদন্তি ভাগ করে নিয়েছেন সেসময়ের স্মৃতি, সাফল্য ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা।
শাইখ সিরাজের তীক্ষ্ণ ও আন্তরিক প্রশ্নে উঠে এসেছে বহু অজানা তথ্য- প্রথম গান গেয়ে তিনি কত পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন, প্রথম শোতে আয়োজকরা কী দিয়েছেন, কীভাবে মাত্র ১২ বছর বয়সে আলতাফ মাহমুদের হাত ধরে সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পেলেন, কিংবা দিলশাদ ইয়াসমিন থেকে কীভাবে পরবর্তী জীবনে সাবিনা ইয়াসমিন হয়ে উঠলেন বাংলা ভাষাভাষি মানুষের প্রিয়তম কণ্ঠস্বর!
‘দীর্ঘ সংগীত জীবনে অতৃপ্তি আছে কিনা?’ শাইখ সিরাজের প্রশ্নটা দর্শকদের জন্য ছিলো বেশ স্পষ্ট, মনে হচ্ছিলো হয়তো গায়িকা কেবল সাফল্যের গল্পই বলবেন! কিন্তু সাবিনা ইয়াসমিনের উত্তর এল একেবারে অন্যরকম— এক ধরনের নিভৃতে বেজে ওঠা অপ্রকাশিত ব্যথার স্বর যেন, তিনি বললেন তারও অতৃপ্তি আছে! কী সে অতৃপ্তি?
সাবিনা ইয়াসমিন জানান, যদিও তার সংগীত জীবনে অনেক সাফল্য এসেছে, তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট নন। বাংলাদেশে সংগীতশিল্পীদের জন্য রয়ালিটির সুষম বন্টন ব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সাবিনা ইয়াসমিনের কথায়, একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, সুরকার বা গীতিকার যদি প্রয়োজনীয় এবং ন্যায্য রয়ালিটি পেতেন, তাহলে তাদের পুরো জীবনটাই স্বচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ হতে পারত। কিন্তু বাংলাদেশে এমন একটি কার্যকরী ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি, যা শিল্পীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।
প্রামাণ্যচিত্রে এই অংশটি নির্মাণশৈলীর দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শাইখ সিরাজ সাবিনার বক্তব্যের মাধ্যমে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির অতৃপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশের সংগীত শিল্পের গভীর একটি সমস্যার দিকেই আলোকপাত করেছেন বলেই মনে হলো। এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সাবলীল ও প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সংগীত সংশ্লিষ্ট মানুষদের তো বটেই, দর্শকের মনেও প্রশ্ন ও সচেতনতা জাগায়।
এই প্রামাণ্যচিত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ও হৃদয়স্পর্শী বিষয় ফুটে উঠেছে- সাবিনা ইয়াসমিনের সামনে উপস্থিত এই প্রজন্মের সাতজন শিল্পী একত্রিত হয়ে সাবিনার গাওয়া পুরনো কালজয়ী গানগুলো পরিবেশন করেন। সেই মুহূর্তে শাইখ সিরাজ প্রজন্মান্তরীয় সংযোগ ও সংগীতের স্থায়িত্ব নিয়ে একটি প্রভাবশালী প্রশ্ন করেন, “সাবিনা ইয়াসমিনের গানগুলো ৫০ বছর পরেও যখন আমরা শুনছি, তখন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, হৃদয়ে দাগ কেটে যাচ্ছে। কিন্তু তোমরা কি মনে করো, আজকের সময় তোমাদের গাওয়া কোনো মৌলিক গান ৫০ বছর পরও শ্রোতাদের এমনভাবে স্পর্শ করবে?”
প্রত্যেক শিল্পী তাদের নিজস্ব ভাবনা ও চিন্তা ব্যক্ত করেন। তবে আলোচনায় যে মূল সংকটটি উঠে আসে, সেটা হলো বর্তমান সময়ে গীতিকবি ও সুরকারদের অভাব! সাবিনা ইয়াসমিনের যুগে গীতিকবিদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আলাউদ্দিন আলী, আমজাদ হোসেন এবং মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের মতো ব্যক্তিত্ব— যারা অসাধারণ গানের রচনা করেছেন, যার কারণে সেই গানগুলো আজও অম্লান হয়ে আছে এবং শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য এবং সংগীতের মৌলিকতার সংকটের বিষয়টি প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে দর্শকের কাছে এমন প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন করার দিকটিও বিশেষ হয়ে উঠবে!
এই প্রামাণ্যচিত্রে সাবিনা ইয়াসমিনের গান নিয়ে কথা বলেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা, সুজাতা ও রোজিনা। তারা বহু সিনেমায় সাবিনার কণ্ঠে গাওয়া গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন, বিশেষ করে ববিতা অভিনীত অসংখ্য চলচ্চিত্রে স্থান পেয়েছে সাবিনার কালজয়ী গান। এসব গানের পেছনের স্মৃতি, শুটিংয়ের মজার অভিজ্ঞতা ও শিল্পীসত্তার গল্প তারা তুলে ধরেছেন। ববিতা আরও শেয়ার করেছেন ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে তার দীর্ঘ বন্ধুত্বের অনন্য স্মৃতিচারণের কথাও। সেই সাথে ববিতার দেখা একটি স্মৃতিচারণে উঠে আসে মা হিসেবে সাবিনা ইয়াসমিনের অসাধারণ মমত্ববোধের গল্পও! দর্শককে যে গল্পটি বিমোহিত করবে!
পুরনো দিনের অনেক শিল্পী আমাদের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছেন। অথচ তাদের সৃষ্টিকর্মের অসাধারণ আর্কাইভাল মূল্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণ করা একান্ত জরুরি। এই সচেতনতার তাগিদ থেকেই নির্মাতা শাইখ সিরাজ কিংবদন্তি গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিনকে নিয়ে ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমিন’ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন; এমনটাই তিনি তার একাধিক বক্তব্যে জানিয়েছেন। তার আগের কাজ ‘রাজাধিরাজ রাজ্জাক’ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রশংসিত হওয়ার পর ‘জুঁই ফুল’ তার ধারাবাহিকতায় একজন শিল্পীর ব্যক্তি জীবন, কর্ম জীবন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং শিল্পজগতের নানা চ্যালেঞ্জকে গভীরভাবে উপস্থাপন করেছে।
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল ইতিহাস সঙ্কলন নয়, বরং একটি সমাজ সচেতনতামূলক প্রয়াস, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
আসছে ৪ সেপ্টেম্বর জীবন্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিন। বিশেষ দিনকে সামনে রেখে শাইখ সিরাজ নির্মিত ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমিন’ প্রামাণ্যচিত্রটি চ্যানেল আই-তে সম্প্রচার হবে ১২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে।








