সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন এবং বিদ্রোহী বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পরিবর্তনের জোয়ার দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে শাসন পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সিরিয়ার এই ঘটনা ইরানের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হয়ে উঠতে পারে।
সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন, হিজবুল্লাহর দুর্বলতা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের ক্ষতি বিশেষভাবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আসাদের পতন: ইরানের জন্য বিপর্যয়ের সুর
সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন এবং বিদ্রোহী বাহিনী ক্ষমতা দখলের ঘটনা ইতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সিরিয়া দীর্ঘ এক দশক ধরে গৃহযুদ্ধের কবলে আছে, যা ইরানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপের ফলে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তাই আসাদ সরকারের পতন ইরানের জন্য একটি বড় ধাক্কা, কারণ এটি সিরিয়ার সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক এবং হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য মিলিশিয়াদের সমর্থনকেও দুর্বল করে দিয়েছে। ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবেরও বড় ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা
আসাদের পতনের ফলে আঞ্চলিক প্রভাব কমে যাওয়ায় ইরানের রাজনৈতিক অবস্থান বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। সরকার বিরোধী আন্দোলনগুলো যেমন- ২০০৯ সালে গ্রিন মুভমেন্ট, ২০২২ সালের হিজাব প্রতিবাদ এবং সম্প্রতি দেশজুড়ে অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষ বিরাজ করছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিদেশি অপচয় নিয়ে জনগণের ক্ষোভ একদিকে যেমন সরকারকে চাপে ফেলছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও বিদেশি নীতির প্রতিক্রিয়া
আসাদের পতন এবং সিরিয়ার সহায়তায় ইরান যেসব অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করেছিল, তা এখন প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। সিরিয়ার তেল, টেলিযোগাযোগ এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ওপর ইরানের যা কিছু নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা হারানোর ফলে ইরান তার অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্রভাবে অনুভব করছে। ইরানে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে “সিরিয়াকে ছেড়ে, আমাদের দিকে তাকাও” এমন স্লোগান। যা সরকারের বিদেশি কৌশলকে কেন্দ্র করে জনগণের ক্ষোভের প্রতিফলন।

তুরস্ক ও ইসরায়েলের প্রভাব
সিরিয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ায় তুরস্ক এবং ইসরায়েল সেখানে প্রভাব খাটাতে চাইছে। তুরস্ক সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি নিজেদের সমর্থন বাড়িয়ে আঞ্চলিক প্রভাবকে শক্তিশালী করছে এবং ইসরায়েল সিরিয়াতে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে তাদের শক্তি কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া, রাশিয়ার সিরিয়া থেকে সরে আসা এবং ইউক্রেনে তার ফোকাস বৃদ্ধি ইরানের জন্য একটি বড় বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সিরিয়ায় ইরানের একক উপস্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কী হতে পারে ইরানের ভবিষ্যত?
ইরানের সম্ভাব্য পতন সিরিয়ার মতো হতে পারে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। যেমন- শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, ইরানেও একই ধরনের অর্থনৈতিক সংকট দেখা যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে ব্যাপক প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, ইরানেও রাজনৈতিক দমনপীড়ন এবং দুর্নীতি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।
তবে ইরানের বিশাল আয়তন, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং বিরোধীদের মধ্যে বিভক্তি এর পতনকে একেবারে সিরিয়ার মতো দ্রুত ঘটানোর পথ কঠিন করে তুলেছে। তবুও সিরিয়ার ঘটনা ইরানকে একটি সতর্ক সংকেত দিয়েছে যে, কোন সরকার শক্তিশালী হলেও চিরকাল অটুট থাকতে পারে না।
সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন ইরান। এই সংকট ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। যদিও এই চ্যালেঞ্জে মোকাবেলা করার ক্ষমতা ইরানের আছে, তবুও যদি ইরান এই অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক চাপের মোকাবেলা করতে না পারে, তাহলে তার জন্য সিরিয়ার মতো পতন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।








