মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকায় সম্ভাব্য সব ধরনের হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শনিবার (৭ মার্চ) আবুধাবি টিভিতে প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আমিরাত সহজ শিকার নয়। আমরা কঠিন সময় মোকাবিলা করতে সক্ষম। আহতদের দেখতে একটি হাসপাতালে গিয়ে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, দেশটি বর্তমানে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, তবে এই সংকট কাটিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শেখ মোহাম্মদ জানান, দেশের নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সুরক্ষার বিরুদ্ধে আসা যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় আমিরাত প্রস্তুত। সাম্প্রতিক হামলায় দুবাইয়ের বিমানবন্দর, পর্যটন কেন্দ্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুবাই মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূপাতিত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি গাড়ির ওপর পড়লে একজন চালক নিহত হন। নিহত ব্যক্তি এশীয় নাগরিক হলেও তার বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় ধরনের হামলার জেরে শুরু হওয়া যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এর মধ্যেই প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে তার বক্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই বলেন, আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের ভূখণ্ড শত্রুপক্ষের কাছে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং এসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত থাকবে।
পরে পেজেশকিয়ানও বলেন, ইরান প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করে যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো না হয়, তবে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে তেহরান উন্মুক্ত।
উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা ও অস্থিরতা
মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশ সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান সবগুলোই ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এসব হামলার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন, আকাশসীমা বন্ধ এবং তেল-গ্যাস উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে, যার প্রতিক্রিয়া বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে।
শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, কেশম দ্বীপের একটি লবণমুক্ত পানি উৎপাদন প্লান্টে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে বাহরাইনের জুফাইর বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, ওই পানি সরবরাহ কেন্দ্রে হামলা “বিপজ্জনক ও গুরুতর পরিণতির” ইঙ্গিত দেয় এবং এতে ৩০টি গ্রামের পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
আমিরাত ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে নতুন হামলা
যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার আমিরাতকে লক্ষ্য করে ১৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২০টির বেশি ড্রোন ছোড়া হয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর আইআরজিসি দাবি করে, আবুধাবির কাছে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বিমান যুদ্ধকেন্দ্রে তাদের ড্রোন আঘাত হেনেছে।
এদিকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি অজ্ঞাত বস্তু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করলে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। গত সপ্তাহে আবুধাবি বিমানবন্দর, পাম জুমেইরা এলাকা ও বিলাসবহুল বুর্জ আল আরব হোটেলের আশপাশেও হামলার ঘটনা ঘটে। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে।
একই দিনে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের সশস্ত্র বাহিনী একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়ে।
কুয়েতও একটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে। দেশটির জাতীয় তেল কোম্পানি নিরাপত্তাজনিত কারণে তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, কারণ হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী হুমকির মুখে পড়েছে।
উত্তেজনা বাড়াচ্ছে নতুন হুমকি
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে খুব কঠোর হামলা চালাতে পারে এবং নতুন লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানার হুমকি দেন।
ফ্লোরিডার মায়ামিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, তিন দিনের মধ্যে মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌবাহিনীর ৪২টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল জানায়, তারা তেহরান ও ইসফাহানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, ৮০টির বেশি যুদ্ধবিমান ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, হরমুজ প্রণালীতে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।
এদিকে ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচনের জন্য বৈঠকে বসবে বলে জানিয়েছেন পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ মোজাফারি। তবে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মতামত গ্রহণ করা হবে না।







