ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ ভাগে বাংলাদেশ সময় রমজানের ভোরের দিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হঠাৎ করে পরিস্থিতি বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনীর তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন যুদ্ধের বাস্তবতা তৈরি হয়। আর দ্বিতীয় দিনেই আসে ‘বড় খবর’, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে ঘোষণা আসে। বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে জটিল!
ইরান পাল্টা প্রতিশোধের অঙ্গীকার করে এবং শুধু ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানানোর ইঙ্গিত দেয়। পরিস্থিতি দ্রুত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেয়। বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাসে হামলা নয়তো বিরাট বিক্ষোভের খবর আসতে শুরু করেছে। উভয়পক্ষের হামলায় মৃত্যুর খবর গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

উপসাগরে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে উপসাগরীয় অঞ্চলে। দুবাইসহ বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, আকাশপথে ফ্লাইট ব্যাহত হয়, আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ সম্পদে ঝুঁকছেন। কিন্তু এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে জ্বালানি বাজারে।
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি সরবরাহ
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই পথে পরিবাহিত হয়েছে। বছরে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলার। ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রধান পথ এটি। এই তেলের ৮৪ শতাংশই যায় এশিয়ার বাজারে, যার বড় অংশ চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এশিয়ার শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকটাই উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটবে। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে সাম্প্রতিক সময়েও দাম ছিল প্রায় সাড়ে ৭২ ডলার। তেলের বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা খুব সীমিত। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছুটা উৎপাদন বাড়াতে পারলেও তা বড় ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে সামান্য সরবরাহ সংকটও বড় মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে অর্থনীতিতে কী হয়
তেলের দাম বাড়লে শুধু পাম্পে খরচ বাড়ে না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে, খাদ্য সরবরাহ চেইন ব্যাহত হয়। সহজ উদাহরণ দিলে বলা যায়, ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাক ভাড়া বাড়ে, ট্রাক ভাড়া বাড়লে চাল-ডাল-সবজির দামও বাড়ে। এর ফল মূল্যস্ফীতি। সম্প্রতি বহু দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছিল। কিন্তু জ্বালানি ব্যয় বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাতে সাহস পাবে না। সুদের হার বেশি থাকলে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে চায় না, বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থানও ধীর হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ, ভারত বা জাপানের মতো তেল-আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের। তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিল বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান কমতে পারে। এতে আবার আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। একে অর্থনীতির ভাষায় ‘চক্রাকার চাপ’ বলা যায়।
বৈশ্বিক বাজারের প্রতিক্রিয়া
বৈশ্বিক বাজারও ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সরিয়ে সোনা বা ডলারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বীমা খরচ বাড়বে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়বে। এসব যোগ হয়ে উৎপাদন খরচ বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেটেই চাপ ফেলবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি
ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলার কিনতে প্রায় ৪৩ হাজার ইরানিয়ান রিয়াল লাগে। তেল রপ্তানি তাদের প্রধান আয়। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে রপ্তানি কমবে, কিন্তু সামরিক ব্যয় বাড়বে। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব আঞ্চলিক বাণিজ্যেও পড়বে।
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটে দাম চারগুণ বেড়ে বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি মন্দায় পড়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব কয়েক মাস নয়, বরং বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে।
বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য
বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের সরাসরি বাণিজ্য খুব বড় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে পাটের সুতা ও তৈরি পোশাক রয়েছে। ইরান থেকে আমদানি খুবই সীমিত। নিষেধাজ্ঞাজনিত ব্যাংকিং জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারিয়েছেন। এক দশক আগে যে ইরানি পণ্য বাংলাদেশে দেখা যেত, এখন তা বিরল।
তবে সরাসরি বাণিজ্য কম মানেই প্রভাব কম নয়। বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে জ্বালানি আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এলপিজি, ডিজেল, পেট্রোল- সবকিছুর দাম বাড়বে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
প্রবাসী আয় ও সামগ্রিক প্রভাব
আরেকটি বড় দিক হলো প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। প্রতিবছর বৈধ পথে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে। এই ফেব্রুয়ারি (২০২৬) মাসেও দেশে এসেছে প্রায় ৩.০২ বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এসব দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হলে শ্রমিকদের চাকরি, আয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। রেমিট্যান্স কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে, টাকার মান দুর্বল হবে। তখন মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হবে। রোজা ও ঈদের সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনিতেই বেড়ে যায়, যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে পণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠবে।
ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও উৎপাদন খরচকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য এর অভিঘাত পরোক্ষ হলেও গভীর। আন্তর্জাতিক রাজনীতি হাজার মাইল দূরে ঘটলেও তার ঢেউ শেষ পর্যন্ত আমাদের রান্নাঘর, বিদ্যুৎ বিল ও বাজারের ঝুড়িতে এসে লাগে।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ব অর্থনীতি আজ গভীরভাবে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। তাই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা শুধু মানচিত্রের একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি পুরোদেশ তথা সিরাজগঞ্জ, রংপুর বা বরিশালের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত! তাই একটাই নিবেদন, দ্রুত বন্ধ হোক এই যুদ্ধ, বিশ্বে ফিরুক শান্তি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







