গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় ‘জঙ্গী নাটক সাজিয়ে’ ৭ যুবককে হত্যার ঘটনায় সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
সোমবার (১৮ আগস্ট) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
গাজীপুরে ৮ অক্টোবর ২০১৬ কী ঘটেছিল?
খুব সম্ভবত ২০১৬ সালে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জঙ্গিবাদ। কয়েক বছরের বিচ্ছিন্ন কিছু হামলার পর সেই বছরই চালানো হয় এযাবতকালের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা- গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে।
সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে ভীতি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা সারাবছরই সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে বারবার উঠে এসেছিল।
গুলশান হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকটি অভিযান চালায় এবং এসব অভিযানে বেশ কিছু জঙ্গি সদস্যও নিহত হয়। সেই বছর জুলাইয়ের ২৫ তারিখেই কল্যাণপুরে এক অভিযান চালায় পুলিশ এবং সেখানে ৯ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।

তারই ধারাবাহিকতায় সেই বছরের ৮ অক্টোবর শনিবার প্রায় একই সময় গাজীপুরের দুটি স্থানে জঙ্গি আস্তানায় র্যাব-পুলিশের অভিযান চলে। এসব অভিযানে ৯ জন নিহত হয়েছিল। এছাড়াও একই সময়ে টাঙ্গাইলে র্যাবের আরেক অভিযানে সন্দেহভাজন দুই জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল আলোচনায়।
অপারেশন স্পেট-এইট
২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর শনিবার সকাল ৯টা থেকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একটি দল গাজীপুর পুলিশের সহায়তায় পাতারটেক এলাকায় একটি দোতলা বাড়ি ঘিরে রাখে। পরে দুপুর ১২টায় ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ ইউনিট সোয়াট সেখানে অভিযান শুরু করে।
সেই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন স্পেট-এইট’। যেটা চলে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। অভিযানের আগে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল, জঙ্গিদের উপস্থিতি নিশ্চিত জেনে অভিযান চালানো হচ্ছে। তখন ওই দোতলা ভবনে থাকা জঙ্গিদের বারবার আত্মসমর্পণের জন্য হ্যান্ডমাইকে আহ্বানও জানিয়েছিলেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছারোয়ার হোসেন।
পুলিশ জানিয়েছিল, আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ভেতর থেকে জঙ্গিরা গুলি করেন। পরে পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে সাত জঙ্গির সবাই নিহত হন।
নিহত জঙ্গিদের প্রকৃত পরিচয় জানার জন্য তাদের আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি পিস্তল, কিছু চাপাতি ও একটি গ্যাস সিলিন্ডার উদ্ধার করা হয় বলেও জানানো হয়েছিল তখন।
অভিযানের পর যা বলা হয়েছিল
র্যাব ও পুলিশের দুই অভিযানের খবরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও গাজীপুরে যান। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান ও জাবেদ পাটোয়ারীও ছিলেন সেখানে।
নিহতদের মধ্যে ‘নব্য জেএমবির’ তৎকালীন শীর্ষ নেতা আকাশ ছিলেন বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন। তিনি বলেছিলেন, আমরা নিশ্চিত তামিম চৌধুরীর পরে যে জঙ্গিদের নেতৃত্ব দিত, তার ছদ্মনাম হোক আর টাইটেল নাম হোক, তার নাম আকাশ। সে এখানে নিহত হয়েছে। নিহত এই সাতজনের মধ্যে সেও একজন।
তিনি বলেছিলেন, এখানে যারা ছিল, সবাই জঙ্গি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। কিছু একটা করার জন্য তারা এখানে ছিল।
অভিযান শুরুর আগে তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন বলেছিলেন, নিউ জেএমবির ঢাকা বিভাগীয় কমান্ডার আকাশ অবস্থান করছেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালে করা মামলায় যা বলা হচ্ছে
২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরে জঙ্গী নাটক সাজিয়ে ৭ জনকে হত্যার অভিযোগে মামলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে- পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও তৎকালীন এসবি প্রধান জাভেদ পাটোয়ারীসহ ৫ জনকে।
আজ সোমবারের (১৮ আগস্ট) শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০১৬ সালে মাদ্রাসাপড়ুয়া সাত ছাত্রকে গুম করা হয়। পরে গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি বাড়িতে বাইরে থেকে তাদের তালাবদ্ধ করা হয়। পরে আবার সেখানে জঙ্গি অভিযোগ দিয়ে সাতজনকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর নিহতরা রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে প্রচার করা হয়।
এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৫ অক্টোবর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০১৬ সালের অক্টোবরে নিহত ৭ জনের একজন ১৯ বছর বয়সী যাত্রাবাড়ীর এক মাদ্রাসার ছাত্র ইবরাহীম। বিচারবহির্ভূতভাবে ছেলেকে গুমসহ হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় একটি অভিযোগ করেন ইবরাহীমের বাবা। পরে এ ঘটনার তদন্ত করেন কর্মকর্তারা।







