ফুয়েল স্টেশনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিরাট লাইন। মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে অভিজাত গাড়ি, সবাই অপেক্ষায় জ্বালানি তেল নিতে। পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে এই কয়েক সপ্তাহে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট, আর তার আঁচ এসে পড়েছে বাংলাদেশেও।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানির কোনো সংকট নেই। ওদিকে ফুয়েল স্টেশনে লম্বা ভিড় দেখে চরম দ্বিধায় জনগণ। যদি তেল না পাওয়া যায়, এই আগাম ভয়ে অনেকে আগে যেখানে তিন-চার দিন পরপর তেল কিনতেন, তারাও প্রায় প্রতিদিনই লাইনে দাঁড়াচ্ছেন সবসময় ট্যাংকি ভরা রাখতে।
আবার অভিযোগ উঠেছে, অনেকে পাম্প থেকে তেল নিয়ে ম্যানুয়ালি বের করে জারিকেন নয়তো প্লাস্টিক বোতলে ভরে বাড়িতে মজুত রাখছেন। অনেক জেলায় গ্রামে-শহরে অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করছে বেশি দামে বিক্রির জন্য। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা-সাজার পরেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এই নেতিবাচক পরিস্থিতি।
কিন্তু যে তেল মানুষ কষ্ট করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন, নয়তো কোনো ব্যবসায়ী অপরিকল্পিতভাবে মজুত করছেন, সেটি কি আসলে নিরাপদ? নাকি ঘরে-বাড়িতে-গোডাউনের ভেতরে তৈরি হচ্ছে নীরব, ভয়াবহ এক বিপদ?
প্যানিক বায়িং: ভয় থেকে জন্ম নেওয়া আরেক সংকট
মানুষ যখন ভয় পায়, তখন প্রয়োজনের বেশি মজুত করতে চায়। এটা স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু এই প্রবৃত্তিটাই এখন সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
যে তেল স্টেশনে প্রতিদিন ৫০০ জনের কথা ভেবে বিক্রির জন্য মজুত থাকে, সেখানে হঠাৎ ৫,০০০ মানুষ আসলে কী হয়? মজুত শেষ হয়ে যায়। আর মজুত শেষ হতে দেখলে আরও বেশি মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ছুটে আসেন। এভাবেই প্যানিক বায়িং নিজেই একটা সংকট তৈরি করে, যে সংকট আসলে আগে ছিলই না।
এর মধ্যে একটি শ্রেণি আছেন, যারা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কিনে কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছেন। যারা সত্যিকার অর্থে প্রতিদিন জীবিকার জন্য তেল দরকার, বাসচালক, ট্রাকচালক, উবার-পাঠাও চালক, কৃষক, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সরকার কি তেল আনছে না বিদেশ থেকে?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো হ্যাঁ, আনছে এবং প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন উৎস থেকে আনছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, মে মাস পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করতে বেশি দামে সিঙ্গাপুর থেকে তেল এনে মজুত করা হচ্ছে। সম্প্রতি আরও ৩ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ এখন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক দেশ থেকে তেল আমদানির ব্যবস্থা করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বাড়লেও বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটাতে দেশের পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। ইরান নিজেও জানিয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।
সরবরাহ চেইনে চাপ আছে, স্বীকার করতে হবে। কিন্তু ‘তেল একেবারে নেই’ এটি পুরোপুরি গুজব এবং মিথ্যা।
ঘরে-গোডাউনে তেল রাখলে কী হয়? আসল বিপদটা জানুন
ঘরে-গোডাউনে তেল রাখার বিষয়টি আসলেই ভয়াবহ বিপদের। বিষয়টি একটু মনোযোগ দিয়ে বোঝা দরকার।
পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন এগুলো শুধু জ্বালানি নয়, অত্যন্ত দাহ্য বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ। পেট্রোলস্টেশনে এগুলো রাখা হয় বিশেষ ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে, কঠোর নিরাপত্তা বিধি মেনে। বাড়িতে জারিকেন বা ড্রামে রাখার ক্ষেত্রে এই বিধিগুলো মানা প্রায় অসম্ভব। নিচের বিষয়গুলো পড়লে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হবে-
বাষ্পীভবন ও অদৃশ্য বিপদ
খোলা বা আধা-খোলা পাত্রে রাখলে পেট্রোল দ্রুত বাষ্পীভূত হয়। পেট্রোলের ফ্ল্যাশপয়েন্ট মাত্র মাইনাস ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অর্থাৎ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই এটি আগুন ধরার জন্য যথেষ্ট বাষ্প ছাড়তে থাকে। এই বাষ্প বাতাসের চেয়ে ভারী, তাই মেঝের কাছাকাছি জমে থাকে। বায়ুতে মাত্র ১.৪% থেকে ৭.৬% পেট্রোল বাষ্প মেশালেই একটি বিস্ফোরণযোগ্য মিশ্রণ তৈরি হয়। একটি সিগারেটের আগুন, একটি বৈদ্যুতিক সুইচের স্ফুলিঙ্গ, এমনকি একটি মোবাইল ফোনের চার্জারও এই মিশ্রণে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।
বাড়িতে জ্বালানি তেল রাখা আইনত অবৈধ ও অনৈতিক
বাংলাদেশের বিস্ফোরক আইন অনুযায়ী, বাড়িতে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দাহ্য পদার্থ মজুত রাখা আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু এর বাইরেও একটা নৈতিক প্রশ্ন আছে, আপনার বাড়িতে যদি আগুন লাগে, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শুধু আপনি নন, পাশের বাড়ির মানুষগুলোও। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে তেল মজুত করা রীতিমতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইতিমধ্যে কয়েক কোটি টাকা অর্থদণ্ড, অবৈধ মজুত করা জ্বালানি তেল জব্দ এবং স্বল্প মেয়াদে বহুজনকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে, যে ব্যক্তি কালোবাজারে মজুত বা লেনদেনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে। আইনটি করা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি, যার উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী কিছু কার্যকলাপ প্রতিহত করা। এটি জ্বালানি তেল অবৈধ মজুতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তেলের মান নষ্ট হয়, ইঞ্জিনের মারাত্মক ক্ষতি
পেট্রোল বেশিদিন রাখলে জারণ প্রক্রিয়ায় (Oxidation) এর মান কমে যায়। সাধারণত তিন মাসের বেশি সংরক্ষণ করলে পেট্রোলের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণ না করলে সেই তেল গাড়িতে ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। মজুত তেল ব্যবহার করতে গিয়ে গাড়ি নষ্ট করলে সেই খরচ বর্তমান জ্বালানি সংকটের কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
শিশু ও বয়স্কদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
জারিকেন বা ড্রাম থেকে তেল ঢালতে গিয়ে মেঝেতে ছলকে পড়া অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। এরফলে বাড়ি বা গোডাউন হয়ে ওঠে চলমান টাইমবোমা, আগুনের কোনো ফুলকি বা সিগারেটের জলন্ত অবশিষ্ট থেকে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এছাড়া বাড়িতে থাকা শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী। বাড়িতে রাখা জারিকেন তাদের কাছে আগ্রহের বস্তু হতে পারে। তেলের বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে গেলে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, এমনকি গুরুতর শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
প্রয়োজনের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো কার কষ্ট বাড়াচ্ছে?
একটু ভেবে দেখুন। যে কৃষক সেচ পাম্পের জন্য ডিজেল না পেয়ে ফসল নষ্ট হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, যে অ্যাম্বুলেন্সটি হাসপাতালে যেতে পারছে না, যে পরিবহন শ্রমিক আজ রোজগার করতে পারেননি, তাদের সংকট তৈরির পেছনে প্যানিক বায়িংয়ের শিকার প্রতিটি মানুষের অতিরিক্ত মজুতের ভূমিকা আছে।
প্রয়োজনের বেশি তেল তুলে নিলে সেটা সংগ্রহ নয়, সেটা অন্যের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া।
এ অবস্থায় আসলে করণীয় কী?
– তেলের মিটার খেয়াল করে শুধু প্রয়োজনমতো তেল নিন। অপচয় কমান ও অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে চলুন, বাড়িতে মজুত রাখবেন না।
– গুজবে কান দেবেন না। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি হয়েছে, আর তা ছাড়া সরকার তেল আনছে, সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি।
– কালোবাজার থেকে খোলা তেল কিনবেন না। সাধের গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হতে পারে ভেজাল জ্বালানির কারণে। তা ছাড়া অবৈধ মজুত করা তেল বিক্রি ও কেনা উভয়ই আইনত দণ্ডনীয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির আভাস ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল আনার সব ব্যবস্থা নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিপদ তেলের সংকট নয়। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ভয়। কারণ সংকটের শঙ্কা থেকে আসে প্যানিক, প্যানিক থেকে আসে মজুত, মজুত থেকে আসে প্রকৃত সংকট। আর সেই সংকটের মাঝে ঘরে রাখা তেলের জারিকেন থেকে একদিন আসতে পারে আসল আগুন।
জ্বালানি তেল জমাবেন না, বিবেক জমান। দেশের এই কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে থাকুন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







