জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব সদস্যরা কেন হামলার শিকার হলেন? র্যাব যেখানে অপরাধীদের ভয়ের কারণ, সেখানে এই অভয়ারণ্যে অভিযানের সময় কারা র্যাব সদস্যকে খুন করল? জঙ্গল সলিমপুর কীভাবে এমন ভয়ঙ্কর স্থান হয়ে উঠল? চলুন জেনে নেওয়া যাক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও দেশের ভেতরের আরেক দেশ খ্যাত জঙ্গল সলিমপুরের বিস্তারিত।
নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের কৌতূহল সবসময়ই বেশি। এই কৌতূহলই পৃথিবীর দুর্গম স্থানগুলোতে অভিযানে মানুষকে উৎসাহিত করেছে। তারপরও পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জঙ্গল সলিমপুরের আগে আরও দুটি এমন জায়গার কথা জেনে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডায় অবস্থিত ‘এরিয়া ৫১’ সামরিক ঘাঁটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় জায়গা। সেখানে কী হয়, তা আজ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করে বলেনি। আর ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত মার্কিন সরকার এই জায়গাটির অস্তিত্ব স্বীকারই করেনি। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে চর্চিত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে গোপন ঘাঁটি। বলা হয়, মার্কিন সেনাবাহিনী ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতারা যখন এই সেনাঘাঁটিতে যান, তখনও উড়োজাহাজ অবতরণের সময় জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে বাইরের কিছু দেখা না যায়।
পৃথিবীর এমন আরেকটি বিচ্ছিন্ন স্থান আন্দামানের উত্তর সেন্টিনেল। জঙ্গলে ঘেরা এই দ্বীপে বসবাস করা আদিম মানুষেরা তথাকথিত সভ্যতার আলো থেকে এরা আজও নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সভ্য জগতের মানুষদের শত্রু বলে মনে করে তারা। এ কারণেই এই দ্বীপটিকে বিপজ্জনক স্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয় এখনো।
এখন যদি প্রশ্ন করা হয়- বাংলাদেশেও কি এমন কোন নিষিদ্ধ অঞ্চল আছে? যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই, নেই প্রসাশনের কিছু করবার ক্ষমতাও। উত্তরে বলা যায়- আছে। চট্টগ্রামেই এমন একটি অঞ্চল আছে যার নাম জঙ্গল সলিমপুর। সীতাকুণ্ড উপজেলার এই জঙ্গলকে অনেকেই ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ এবং ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। অথচ জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কথা ছিল সংরক্ষিত বনভূমি, কিন্তু হয়েছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। আপনি শুনে আশ্চর্য হবেন, জঙ্গল সলিমপুরে সাধারণ মানুষ ঢুকতে পারে না। বাসিন্দাদের জন্য আছে আলাদা পরিচয়পত্র। হঠাৎ করে বাংলাদেশে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে আলোচনার কারণ, গত ১৯ জানুয়ারি কয়েকজন ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে’ গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে র্যাবের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত র্যাবের সদস্যরাই সেখানে হামলার শিকার হয়ে ফেরত চলে আসে। শুধু তাই নয়, ওই হামলায় র্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং আরও তিনজন র্যাব সদস্য আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
র্যাবের ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, সম্প্রতি সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয় সেই হামলার সিসিটিভি ফুটেজ। সেখানে দেখা গেছে, কিছু লোক র্যাবের দু’টো মাইক্রোবাসকে লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করছে এবং গাড়ির গøাস ভাঙচুর করছে, র্যাবকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে গুলি চালাচ্ছে। হামলাকারীরা এক পর্যায়ে র্যাবের কয়েকজন সদস্যকে এবং র্যাবের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। র্যাবের বরাত দিয়ে জানা যায়, অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ জন মিলে এই হামলা চালিয়েছে।
বনভূমি না হয়ে কেন ও কিভাবে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হলো এই জঙ্গল সলিমপুর?
এলাকাটির নাম শুনলেই মনে হয় যেন এটি দূরের কোনো দুর্গম এলাকা। কিন্তু বাস্তবে চট্টগ্রাম শহর থেকে সেখানে যেতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ মিনিট। সীতাকুণ্ড উপজেলার এ ইউনিয়নটির পূর্বে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা। জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় তিন হাজার একর খাস জমি। নব্বই দশকে শুরু হয় দখল। গড়ে ওঠে ইয়াছিন, রোকন, গফুরসহ বহু প্রভাবশালী গ্রুপ। আধিপত্য ধরে রাখতে রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয় ব্যবহার করে তারা। জানা যায়, পাহাড় কেটে বানানো এই খাসজমির বাজার মূল্য বর্তমানে কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এটি এখন ‘সন্ত্রাসীদের’ দখলে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয় আর প্রশাসনের দুর্বলতায় গড়ে উঠেছে অপরাধের এই দুর্গ। মূলত, জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম ও পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এখানে তুলনামূলকভাবে কঠিন। তাই, কার্যত এটি অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ২০-২৫ হাজার বাড়ি আছে, যাতে অন্তত এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বসবাস এবং এদের বেশিরভাগই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে এখানে জুড়েছেন। ছিন্নমূল এইসব মানুষ বাইরের চেয়ে অনেক কম খরচে জঙ্গল সলিমপুরে থাকতে পারেন বলে সিএনজি চালক, ভ্যানওয়ালা, ট্রাকচালক থেকে শুরু করে আরও অনেক পেশাজীবীদের কাছে স্থানটি বেশ জনপ্রিয়। তবে জানা গেছে, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও ওখানে থাকে।
জানা যায়, পাহাড়ঘেরা বনভূমি জঙ্গল সলিমপুরে নব্বই দশকের শীর্ষ সন্ত্রাসী আলী আক্কাসের মাধ্যমে এ এলাকার গোড়াপত্তন হয়। শুরুতে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পাহাড়ি খাস জমি বিক্রি শুরু করে আক্কাস বাহিনী। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সরকারি খাস জমি দখল করে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি অবৈধ বসতি। পাহাড় কেটে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার স্ট্যাম্পের মাধ্যমে প্লট বিক্রি করা হয়। এ বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনী। একেকটি বাহিনীতে সদস্য রয়েছে দেড়শো থেকে আড়াইশো।
তো কেন এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না?
জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে নেই। এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ না নিতে পারার পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে মূল কারণ বলে থাকেন অনেকেই। জঙ্গল সলিমপুরে অন্তত ২০ হাজার লোকের ভোট। এলাকার মানুষের জন্য বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থাও রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এটিকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। কখনো ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে, কখনো বিভিন্ন প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের অজুহাতে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে একবার র্যাবের সাথে ‘সন্ত্রাসীদের’ গোলাগুলি হয় এবং ওই বছরই সলিমপুরে অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে জেলা প্রশাসনের লোকদের বাধা দেওয়া হয়। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের শাখা, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এখন প্রকল্পগুলোর তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর এ এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, খুনাখুনি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ১৭ মাসে এ ঘটনায় খুন হয়েছেন কমপক্ষে সাতজন। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রæপের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন কয়েক শ। সন্ত্রাসীদের বিশেষ অঞ্চল হিসেবে কুখ্যাতি পাওয়া এ এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার বাধার মুখে পড়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ এলাকাটি নিয়ে কোন দফারফা করতে পারছেন না- তার কারণ, এখানে বসবাসরত অজস্র মানুষ। নিজেদের শেষ ঠিকানা রক্ষায় প্রসাশন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কোন অভিযানে ‘মানব ঢাল’ হয়ে সন্ত্রাসীদের বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ায় জঙ্গল সলিমপুরের মানুষ। সাধারণ মানুষের হতাহতের ঝুঁকির কথা বিবেচনায় শক্ত কোন অভিযান চালাতে পারে না প্রশাসন।








