মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ বন্ধে ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ইরানের কাছে পাকিস্তানের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আল জাজিরা।
এই পরিকল্পনায় এক মাসের যুদ্ধবিরতি, পারমাণবিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে “গঠনমূলক আলোচনা” হয়েছে। তবে ইরান এ ধরনের কোনো আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র “নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছে।”
চলমান যুদ্ধে ইতোমধ্যে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানে সরকারি হিসেবে প্রায় ১,৫০০ জন নিহত এবং ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ করে দেয় ইরান, যদিও পরে কিছু নির্দিষ্ট দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে এবং তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

মার্কিন প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনায় রয়েছে—
- ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি
- ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস বা সীমিত করা
- ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখা
- আন্তর্জাতিক তদারকি জোরদার
- ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমা আরোপ
- আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ
- জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ
- হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা
- ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া

ইরানের অবস্থান
ইরান বলছে, তারা কোনো আলোচনায় নেই এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে “কখনোই কোনো চুক্তি হবে না।”
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান শান্তির জন্য কিছু শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—ইরানের বৈধ অধিকার স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে হামলা না করার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা।
আলোচনার সম্ভাবনা কতটা?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা এখনো অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন, ইরান সীমিত পর্যায়ে সংলাপে বসতে আগ্রহী হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা না হলেও “যোগাযোগ” বা বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। একটি সূত্র জানায়, ইরান সংঘাতের অবসানে “টেকসই প্রস্তাব” শুনতে প্রস্তুত।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত, তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার বজায় রাখতে চায়। পাশাপাশি দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি, তেল আয় ও বিমান খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দেশটিকে আলোচনার দিকে ধাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের উচ্চ ব্যয় উভয় পক্ষকেই আলোচনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরান-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবি মনে করেন, আলোচনার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ।
তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর উপসাগরীয় দেশ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারদের চাপ বাড়ছে, কারণ এই যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানি বাজার ও শেয়ারবাজারে পড়ছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও জনমতের চাপ রয়েছে, যেখানে অধিকাংশ ভোটার এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে না।
অন্যদিকে, ইরানও প্রাণহানি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর চাপের মুখে রয়েছে।
মধ্যস্থতায় সক্রিয় বিভিন্ন দেশ
বিশ্লেষকদের মতে, মিসর, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করেছে, যা আলোচনার পথ তৈরি করছে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য এখনো অনেক বেশি, ফলে আলোচনা সফল হবে কি না তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখন আর নেই। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের খরচ বাড়তে থাকায় দুই পক্ষই এখন নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করছে।








