আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমর দিন ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসমুদ্রের সামনে এক যুগান্তকারী ভাষণ দেন। এই ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।
১৯৪৭ সালে ধর্মীয় ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিরা ২৩ বছর ধরে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬ দফা আন্দোলনসহ নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে তোলে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান। এই প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালির দীর্ঘদিনের বঞ্চনা-নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন এবং স্পষ্ট ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
সেদিন ঢাকা ছিল মানুষের শহর। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লাখো মানুষ ছুটে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ শোনার জন্য। স্লোগানে-মিছিলে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজধানী। ভাষণে বঙ্গবন্ধু দেশবাসীকে সাত দফা নির্দেশনা দেন। অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, প্রতিটি ঘরকে দুর্গে পরিণত করা এবং শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। এই ভাষণ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
ভাষণের সম্প্রচার নিয়ে ঘটে উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা। পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারে লাইভ সম্প্রচারের অনুমতি দেয়নি। প্রতিবাদে বাঙালি কর্মচারীরা কাজ বর্জন করেন, ফলে বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্র অচল হয়ে পড়ে। শ্রোতারা অধীর আগ্রহে রেডিওর সামনে অপেক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে কর্তৃপক্ষ ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দিলে বেতার পুনরায় চালু হয়।
এই ভাষণ বিশ্বের কালজয়ী ভাষণগুলোর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো এটিকে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ আন্তর্জাতিক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম এমন স্বীকৃতি।







