মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় আতঙ্কে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে তেল কেনা শুরু করেন ভোক্তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জ্বালানি তেল কেনার ওপর সীমা আরোপ ও ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ ভিড় দেখা যায় এবং সরবরাহ বাড়ানোর দাবি ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেল কেনার সীমা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় শনিবার (১৪ মার্চ) সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেয়। রোববার (১৫ মার্চ) সকালে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, শুরুতে মজুত নিশ্চিত রেখেই সতর্কতার অংশ হিসেবে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে ফিলিং স্টেশন মালিক ও পরিবহন খাতের চাপ এবং আসন্ন ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে তেল বিক্রির সীমা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বৈশ্বিক পর্যায়েই জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ এর সমাধান খুঁজছে। তিনি জানান, আগাম সতর্কতা থেকেই জ্বালানি তেল সরবরাহে সীমা আরোপ করা হয়েছিল। তবে রোববার থেকে আর কোনো রেশনিং থাকবে না।
বর্তমানে জাপানে অনুষ্ঠিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক এনার্জি সিকিউরিটি’ বিষয়ক দুই দিনের মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন জ্বালানিমন্ত্রী। ১৪ থেকে ১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এর আগে অস্বাভাবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করা হয়। পরে ১০ মার্চ রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেলের জন্য সীমা কিছুটা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫ লিটার করা হয়। পাশাপাশি ৭ মার্চ থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদার তুলনায় ২৫ শতাংশ কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল। পরে ১১ মার্চ বিভাগীয় শহরগুলোতে সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়। তবুও পর্যাপ্ত সরবরাহের দাবিতে ফিলিং স্টেশন মালিকেরা সংবাদ সম্মেলন করেন এবং খুলনায় শনিবার ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখেন।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, মার্চ মাসে জ্বালানি তেল নিয়ে মোট ১৮টি জাহাজ দেশে আসার কথা রয়েছে। ১৪ মার্চ পর্যন্ত ৬টি জাহাজ পৌঁছেছে এবং ২৭ মার্চের মধ্যে আরও ৬টি জাহাজ আসার সূচি রয়েছে। বাকি ৬টি জাহাজের সময়সূচি এখনও নিশ্চিত হয়নি। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন তেল থাকে এবং বেশির ভাগই ডিজেল বহন করে।
বর্তমানে দেশে প্রায় দুই লাখ টন ডিজেল মজুত রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেলও রয়েছে। প্রতিদিন দেশে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন।
অন্যদিকে অকটেন ও পেট্রলের মজুত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার টন করে। দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টন পেট্রল ও অকটেন উৎপাদিত হচ্ছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ টন।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, মার্চ মাসে জ্বালানি তেলের বড় কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কেউ অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করলে সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চুক্তি থাকলেও অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ভবিষ্যতে সরবরাহকারীরা সমস্যায় পড়তে পারে। তাই সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। এ জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে।
ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। এ বছরের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল পাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত সরবরাহ চেয়ে ইতিমধ্যে ভারতের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মার্চে ২০ হাজার টন এবং এপ্রিলে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সমুদ্রপথে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেডের কাছ থেকেও অতিরিক্ত তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।








