১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি হলেও এখনও পার্বত্য জেলা বান্দরবানে শান্তি ফিরে আসেনি। অপহরণ, চাঁদাবাজি, লুটপাট চলছেই। সাথে বিভিন্ন সংগঠনের সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ। সম্প্রতি পাহাড়ের দুই ব্যাংকের তিন শাখায় ডাকাতি করে সশস্ত্র গোষ্ঠী কেএনএফ। এর ফলে নতুন করে আলোচনায় পাহাড়ের ভবিষ্যৎ।
শান্তি চুক্তির মাধ্যমে শান্তি ফেরার কথা থাকলেও মূলত পর্বত্য বান্দরবান জেলায় জেএসএস মূল, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও মগ পার্টি নামে চারটি সংগঠনের বিভিন্ন ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে, অশান্তি ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তারমাঝে ২০২২ সালে নতুন করে যোগ হয় কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ।
মূলত ২০২২ সালের গোড়ার দিকে কেএনএফের নাম নজরে আসে, আসতে থাকে তাদের নানা তৎপরতার খবর। তখন ফেসবুকে পেজ খুলে এই গোষ্ঠী তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়। সঙ্গে ছিল সশস্ত্র তৎপরতা। বান্দরবানের বম জাতিগোষ্ঠীর কিছু ব্যক্তি এটি গড়ে তুলেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়।
কেএনএফ ফেসবুক পেজে দাবি করে, রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলের ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। সেগুলো হলো বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো ও খুমি। তারা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি এবং বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম—এই উপজেলাগুলো নিয়ে আলাদা রাজ্যের দাবি করে। তাদের কল্পিত সেই ‘রাজ্যের’ মানচিত্রও তাদের পেজে দিয়ে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা একাধিক বিবৃতিতে কথিত এই সংগঠন জানায়, কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) নামে একটি সশস্ত্র দল গঠন করেছে তারা। তাদের মূল সংগঠনের সভাপতি নাথান বম।
সাম্প্রতিককালে অপহরণ, চাঁদাবাজির যেসব ঘটনা ঘটছে তার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রশ্নে কেএনএফ এর মুখপাত্র পরিচয়দানকারী ক্যাপ্টেন ফ্লেমিং নামের একজন একটি বেসরকারি পত্রিকায় বলেন, তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ পাহাড়ের আরেক আঞ্চলিক দল জেএসএস। কেএনএফ এর নামে তারাই চাঁদাবাজি করছে।
বেসরকারি পত্রিকায় দেওয়া অনলাইন সাক্ষাৎকারে একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ফ্লেমিং। দীর্ঘপ্রতিক্ষার পর কেএনএফ এর সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলছে এই পর্যন্ত তাদের দাবী কতটুকু পূরণ হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে কেএনএফ এর ইনফরমেশন ও ইন্টেলিজেন্ট শাখার এই সদস্য বলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে, পরবর্তী ধাপে না পৌঁছা পর্যন্ত এখনই আলোচনা বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা জানান।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর প্রশ্ন উঠে কেএনএফ এর বিস্তৃত এলাকা নিয়ে। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে থানচির কিছু অংশ ও রুমা, রোয়াংছড়ি মিলিয়ে অন্তত পাচঁ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছে।

চলমান শান্তি আলোচনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাহাড়ের অবস্থা ততো ভালো নয়, আলোচনা আগামীতে আরও ফলপ্রসু হবে। আমরাও এই আলোচনা এগিয়ে নিতে চাই। প্রতিপক্ষ তাদের নিয়ে নেগেটিভ প্রচারণা চালাচ্ছে। তারপর পাহাড়ে শান্তি ফেরার জন্য যা করা দরকার সেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সমগ্র জাতির জন্য সবকিছুই করবেন তারা।
পাহাড়ে এমন অস্থিরতা কতটা প্রভাব পড়বে সেখানে বসবাসরত সাধারণ মানুষের। এই বিষয়ে প্রথম আলোতে আলাপকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত থাকা নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, কেএনএফের নতুন করে এই হামলার বড় ধরনের প্রভাব আছে। এর ফলে পাহাড়ে, বিশেষ করে কেএনএফ অধ্যুষিত এলাকাগুলোর শান্তি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে গেল।
তার ধারণা, কেএনএফের সঙ্গে হয়তো পাহাড়ের আর কোন বড় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন যোগাযোগ সৃষ্টি করেছে। বড় গোষ্ঠী চাইছে না এখনই শান্তি আলোচনায় যাক কেএনএফ। কারণ, এতে তাদের প্রভাববলয় নষ্ট হয়ে যাবে। কেএনএফের সশস্ত্র তৎপরতার সঙ্গে ভারতের মণিপুরের কুকিদের সঙ্গে স্থানীয় মেইতেইদের সঙ্গে চলমান সশস্ত্র বিরোধ, মিয়ানমারের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারি বাহিনীর অব্যাহত সংঘাতকে দূরে রাখার অবকাশ নেই বলেই মনে করেন তিনি।
পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে (কেএনএফ) নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি বলেন, বান্দরবানের থানচি ও রুমায় ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার পর কুকি-চিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কিছু কার্যক্রমের খবর আসছে, আগামীতে আরও ভালো খবর আসবে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। এই নীতির কারণে আমরা যেভাবে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ করেছি, পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীসহ সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যারা পাহাড়ে অপরাধ সংগঠিত করার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ কল্যাণ পাটির চেয়ারম্যান এবং বীরপ্রতীক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম চ্যানেল আই’র এক অনুষ্ঠানে বলেন, সরকার, প্রশাসন এবং যৌথবাহিনী অর্থ্যাৎ সকলকিছু এক জায়গায় আনতে হবে। একটি সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। একটি শাখা থেকে কমান্ড করতে হবে। একটি পয়েন্ট থেকেই সকল আদেশ, নির্দেশ বের হতে হবে। আর সেই পয়েন্ট হতে হবে সরকারের আদেশে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর বিকল্প নেই। তাদেরকে সেই নির্দেশনা দিতে হবে।

তিনি বলেন, শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও ঠিক এই মুহূর্তে পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণে কারা রয়েছে সেই বিষয়ে কারও জানা নেই। পর্বত্য অঞ্চলে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখনও চলছে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








