যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে গত এক মাসের মন্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে এক অদ্ভুত এবং পরস্পরবিরোধী চিত্র ফুটে ওঠে। কখনো তিনি জয়ের ঘোষণা দিচ্ছেন, কখনো মিত্রদের হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো চরমসীমা বেঁধে দিয়ে তা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
নিচে তার গত এক মাসের মন্তব্যের একটি পূর্ণাঙ্গ কালপঞ্জি এবং বর্তমান পরিস্থিতির একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
৩ মার্চ: “আমরা যুদ্ধ জিতেছি।”
৭ মার্চ: “আমরা ইরানকে পরাজিত করেছি।”
৯ মার্চ: “আমাদের অবশ্যই ইরানে হামলা চালাতে হবে।”
৯ মার্চ: “যুদ্ধ প্রায় পুরোপুরি এবং খুব সুন্দরভাবে শেষ হচ্ছে।”
১১ মার্চ: “আপনি কখনোই খুব আগেভাগে বলতে পছন্দ করবেন না যে আপনি জিতেছেন। আমরা জিতেছি। প্রথম ঘণ্টাতেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।”
১২ মার্চ: “আমরা জিতেছি, কিন্তু এখনো পুরোপুরি জিতিনি।”
১৩ মার্চ: “আমরা যুদ্ধ জিতেছি।”
১৪ মার্চ: “দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন।”
১৫ মার্চ: “আপনারা যদি আমাদের সাহায্য না করেন, তবে আমি নিশ্চিতভাবে তা মনে রাখব।”
১৬ মার্চ: “আসলে, আমাদের কোনো সাহায্যেরই প্রয়োজন নেই।”
১৬ মার্চ: “আমি শুধু পরীক্ষা করে দেখছিলাম কে আমার কথা শুনছে।”
১৬ মার্চ: “ন্যাটো সাহায্য না করলে তাদের খুব খারাপ কিছুর সম্মুখীন হতে হবে।”
১৭ মার্চ: “আমাদের ন্যাটোর সাহায্য প্রয়োজনও নেই এবং আমরা তা চাইও না।”
১৭ মার্চ: “ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমার কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।”
১৮ মার্চ: “হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে আমাদের মিত্রদের অবশ্যই সহযোগিতা করতে হবে।”
১৯ মার্চ: “মার্কিন মিত্রদের নিজেদের সামলে নেওয়া উচিত – এগিয়ে আসা এবং হরমুজ প্রণালী খুলতে সাহায্য করা উচিত।”
২০ মার্চ: “ন্যাটো কাপুরুষ।”
২১ মার্চ: “যারা হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে, তাদেরই এটি রক্ষা করতে হবে। আমরা এটি ব্যবহার করি না, তাই এটি আমাদের খোলার প্রয়োজন নেই।”
২২ মার্চ: “এটাই শেষবার। আমি ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। প্রণালী খুলে দাও।”
২২ মার্চ: “ইরান শেষ।”
২৩ মার্চ: “ইরানের সাথে আমাদের খুব ভালো এবং ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।”
২৪ মার্চ: “আমরা উন্নতি করছি।”
২৫ মার্চ: “তারা আমাদের একটি উপহার দিয়েছে এবং উপহারটি আজ এসে পৌঁছেছে। এটি অনেক অর্থের সমমূল্যের একটি বিশাল উপহার। আমি আপনাদের বলব না সেই উপহারটি কী, তবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুরস্কার।”
২৬ মার্চ: “চুক্তি করো, না হলে আমরা তাদের ধ্বংস করতেই থাকব।”
২৭ মার্চ: “ন্যাটোর জন্য আমাদের সেখানে থাকার দরকার নেই।”
২৮ মার্চ: কোনো উল্লেখযোগ্য মন্তব্য নেই।
২৯ মার্চ: দাবি করেছেন যে আলোচনা এগোচ্ছে।
৩০ মার্চ: “অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দাও, না হলে ধ্বংসাত্মক পরিণতির জন্য প্রস্তুত হও।”
৩১ মার্চ: দাবি করেছেন যে চুক্তি “খুব কাছাকাছি” এবং ইরান “সঠিক কাজটিই করবে”।
১ এপ্রিল: “খুব শিগগিরই আমরা দেখব কী ঘটে।”
২ এপ্রিল: পুনরায় বলেছেন যে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে না হলে হামলা অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
৩ এপ্রিল: “বড় কিছু ঘটতে চলেছে।”
৪ এপ্রিল: বলেছেন ইরানকে “অবিলম্বে” নির্দেশ মানতে হবে, নয়তো আরও পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।
৫ এপ্রিল: “ওই ফ*কিন প্রণালীটা খুলে দে, উন্মাদ জারজরা, নইলে তোদের নরকে বাস করতে হবে – শুধু দেখতে থাক! আল্লাহ’র প্রশংসা হোক।”
উপরের কালপঞ্জি থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে মার্কিন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ইরান নীতি নিয়ে চরম সমন্বয়হীনতা কাজ করছে। বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে প্রেসিডেন্ট একদিকে ন্যাটো এবং অন্যান্য মিত্রদের উপর দায় চাপাচ্ছেন, অন্যদিকে একাই সব সমাধানের কথা বলে সামরিক হামলার হুমকি দিচ্ছেন।
এই দ্বিমুখী নীতির কারণ হতে পারে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ইরানের সাথে পর্দার আড়ালের কোনো আপস রফা। ২৫ মার্চ তার ‘উপহার’ পাওয়ার দাবি এবং পরবর্তীতে ৫ এপ্রিল ইস্টার সানডের দিনে অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় দেওয়া আল্টিমেটাম প্রমাণ করে যে, সংকট সমাধানের পথ এখনো অনেক দূরের এবং মার্কিন প্রশাসন একটি অস্থিতিশীল কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে।
প্রেসিডেন্টের এই লাগামহীন মন্তব্য এবং অস্থির সিদ্ধান্তে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই প্রেসিডেন্টের মানসিক সুস্থতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সমালোচক এবং বিরোধী শিবিরের অনেকের মতে, “এই লোকটি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। আজকাল একজন মার্কিন নাগরিক হওয়ার অনুভূতি হলো মাতাল চালকের চালানো গাড়ির পেছনের আসনে বসে থাকার মতো; আমরা কেবল আতঙ্কের সাথে চেয়ে দেখতে পারি এবং আশা করতে পারি যে কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ এসে দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করবে এবং এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অবসান ঘটাবে।”







