ইশতেহার কী? নির্বাচনে ইশতেহার কেন প্রয়োজন হয়? এই ভূখণ্ডে ব্রিটিশ শাসনামলের শেষভাগে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক সংকট, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক বাঁকের মধ্যদিয়ে যেসব দল তৈরি হয়েছিল, তাদের প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারের ভাষা ও অঙ্গীকার কেমন ছিল? সেসবের বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
ইশতেহার হলো ঘোষণাপত্র বা অঙ্গীকার। নির্বাচনে বিজয়ী হলে রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যতে কী করবে, জনগণের উদ্দেশে দেওয়া সেই ঘোষণাপত্রকেই মূলত ইশতেহার বলা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচিত হলে সেসব ওয়াদা অনুযায়ী কাজ করে থাকে। ইশতেহার দেখে জনগণও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে যে, তারা কোন দলকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে। এজন্য ইশতেহারের গুরুত্ব রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারে না।
ইশতেহার শব্দটি আবারও আলোচনায় এসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ৩৬ দফার এই ইশতেহারকে তারা বলছে তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার। এই ইশতেহারে কী কী বিষয় রয়েছে? সেসব বিষয় আমরা জানব।
তবে শুরুতেই শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির কথা বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগে বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার শোষণ, কৃষক সমাজের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং একইসঙ্গে বাংলায় মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান- এই তিনটি বাস্তবতায় নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯২৯ সালে পূর্ববঙ্গে এই পার্টি তৈরি হয়। নিপীড়িত কৃষক-প্রজার দল হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা দলটির প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধান দাবি ছিল জমিদারি প্রথার বিলোপ। এছাড়া জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ, প্রকৃত চাষির হাতে জমির মালিকানা স্বীকৃতিসহ ঋণের ভার লাঘব এবং পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মতো মৌলিক দাবিগুলো ১৪ দফায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। সেসময় বাংলার কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগ কোনো দলই এরকম জনবান্ধব ও কৃষককেন্দ্রিক নির্বাচনী ইশতেহার দিতে পারেনি। তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ দ্রæতই সুবিধাভোগী ও আমলাতান্ত্রিক দলে পরিণত হওয়ায় আওয়ামী মুসলিম লীগের উত্থান হয়।
আওয়ামী মুসলিম লীগের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা আসে ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে। সেসময় দলটির প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল কেন্দ্রীয় শাসনের বৈষম্য, বাংলা ভাষার ওপর দমননীতি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি। এছাড়া কালাকানুন বাতিল, বিনাবিচারে আটক বন্দীর মুক্তি, সংবাদপত্র ও সভাসমিতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবিও এতে ছিল। সর্বোপরি, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি যুক্তফ্রন্টের ২১ দফাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মুক্তির ঘোষণাপত্রে পরিণত করে। ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের আবহেই এই দল দ্রুত গণমানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ১৯৫৫ সালে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ রাখা হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহ্যবাহী এ দলটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চালানো গণহত্যার অভিযোগে বর্তমানে নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলটি অংশগ্রহণ করতে পারছে না।
মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিক হতাশা থেকে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর গঠন করা হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, জাসদ। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মূল নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, এম এ জলিল, শাজাহান সিরাজ ও কর্নেল (অব.) আবু তাহের। জাসদের প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্বাচনব্যবস্থাকে বলা হয়, সাধারণ মানুষকে ঠকানোর একটি ফন্দি ও মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও বিক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলমাত্র। জাসদ সংবিধানকে ‘আজব কেতাব’ বলে আখ্যায়িত করে, ইশতেহারে নিজস্ব সাংবিধানিক রূপরেখা ঘোষণা করে। সেখানে বলা হয়, রাষ্ট্র হবে জনগণের প্রতিষ্ঠান। শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ পৃথক করা, সমাজতান্ত্রিক নীতিবিরোধী সব আইন বাতিল, ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা এবং জনগণের জীবিকা, শিক্ষা ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্রকে বহন করার কথা বলা হয় জাসদের ইশতেহারে।
১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল, একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় রাজনীতিতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার উত্থানসহ জনগণের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে রেখে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
বিএনপি প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১৯৭৯ সালে। সেসময় তাদের ইশতেহারে নারী ও যুবসমাজকে জাতীয় উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। নারীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন কমপক্ষে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য ঘোষণা করে বিএনপি। ইশতেহারের ঘোষণাপত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় বীরের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাদের কল্যাণে বিশেষ তহবিল জোরদারের কথা বলা হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও বেসামরিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর সামরিক কর্তৃত্ব বজায় রেখেই দলীয় ও রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা, নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিজেদের অনুক‚লে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠন করা হয় জাতীয় পার্টি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাতীয় পার্টি গঠনের পর থেকেই সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন ছাড়া প্রায় সব জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ১৯৯৬ সালের আগে জাতীয় পার্টির কোনো নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয়নি। পরে জাপার নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠকরা ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে গড়ে তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি। দলটির ঘোষিত তারুণ্য ও মর্যাদা শিরোনামের ইশতেহারে মূলত প্রাধান্য পেয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের অঙ্গীকার। এছাড়া ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীডন বন্ধ এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোন প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়ন প্রতিহত করার ঘোষণাও দিয়েছে তারা। মুদ্রাস্ফীতি কমানো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং চাঁদাবাজি বন্ধসহ নানা ধরনের বিষয় এতে স্থান পেয়েছে। মূলত: এনসিপি এতদিন যেসব বিষয় বলে আসছিল- তার আলোকেই ৩৬ জুলাই ধারণা থেকে ৩৬ দফার ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এই ইশতেহার বাস্তবায়নে তারা কতটুকু সফল হয়, এটিই এখন দেখার বিষয়।








